পর্ব এক
অধ্যায় ১
টিএসসি’র চায়ের পাশে
------------------------------
চায়ের দোকানের পাশে কয়েকজন মানুষ জড়ো হয়ে আছে। সবাই খুব মন দিয়ে কারো কথা শুনছে এমন না। কেউ চায়ে চুমুক দিচ্ছে, কেউ মোবাইলে স্ক্রল করছে, কেউ সিগারেট ধরিয়েছে। কথাগুলো বাতাসে ভাসছে। টিএসসি’র বাতাসে এমনিতেই শব্দের জোয়ার থাকে। কেউ কারো কথা পুরোটা শুনে না। কেউ কারো চোখের দিকে তাকিয়ে থামে না। কেউ কেউ আসে শুধু ঘুরতে, শুধু বসতে, শুধু নিজের ভেতরের শব্দগুলোকে একটু বাইরে ফেলে দিতে।
মেঘলা সেখানে আসেনি কথা শোনার জন্য।
সে এসেছে তিথির সঙ্গে।
তিথি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্রী। কথার গতি তার হাঁটার চেয়েও বেশি। কোথাও গেলে তার প্রথম কাজ হয় পরিচিত মুখ খুঁজে বের করা। টিএসসি তিথির কাছে ঢাকার একটা বড় উঠোন। এখানে এলেই সে এমনভাবে হাঁটে, যেন তাকে কেউ থামাতে পারবে না।
মেঘলা তিথির বিপরীত।
মেঘলা কম কথা বলে। বেশি দেখে। বেশি বোঝে। তার চোখে একটা শান্ত কড়া রেখা থাকে। সে চশমা পরে। চশমার কাচের আড়ালে নিজের চোখটা যেন নিরাপদ থাকে। মেঘলা নিজেও ঠিক জানে না কেন নিরাপদ লাগে। শুধু জানে, মেডিকেলে পড়া মানে প্রতিদিন নিজের ভেতরে একটা কঠোরতা তৈরি করা। কঠোরতা না থাকলে রাত জাগা যায় না। কঠোরতা না থাকলে কাটা যায় না ভয়, ঘুম, অবসাদ।
তিথি চায়ের কাপ হাতে হঠাৎ বলল,
এই যে, ওই ছেলেটাকে দেখছিস?
মেঘলা তাকাল।
একটা ছেলে বেঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। পরনে সাধারণ শার্ট। চুল এলোমেলো। খুব গোছানো কেউ না। সে খুব বেশি কথা বলছে না। বরং আশেপাশের দু তিনজনের কথার ফাঁকে ফাঁকে ছোট করে কিছু বলছে। যারা দাঁড়িয়ে আছে তাদের কেউ খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছে না। কেউ পাশ ফিরে কথা বলছে। কেউ হেসে উঠছে অন্য কারো কথায়। তবু যখন ছেলেটা কথা বলে, আশেপাশের গুঞ্জনটা যেন একটু কমে যায়। শব্দটা পিছিয়ে যায়। তার কথার ভেতরে খুব জোর নেই, খুব নাটকও নেই। তবু তার কথা একটা অদ্ভুত জায়গায় এসে ঠেকে।
মেঘলার চোখ আটকে গেল ছেলেটার চোখে।
চোখে গভীরতা আছে। আবার সেই গভীরতার নিচে চাপা ক্লান্তি। এমন ক্লান্তি, যেটা রাত জেগে পড়ার ক্লান্তি না। বরং অনেকদিন ধরে নিজের ভেতরের প্রশ্নগুলো বয়ে চলার ক্লান্তি। মেঘলা এই ক্লান্তি চেনে। মেডিকেলে এসে সে দেখেছে, কিছু মানুষের শরীরে রোগ থাকে, আর কিছু মানুষের চোখে থাকে। চোখের রোগের নাম কেউ দেয় না, তবু সেটা সবচেয়ে বেশি ছড়ায়।
মেঘলা খুব আস্তে বলল,
কে?
তিথি কণ্ঠে অদ্ভুত গর্ব নিয়ে বলল,
নির্ঝর। আমাদের স্কুলের সবচেয়ে ভালো স্টুডেন্ট ছিল। চাইলে মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়তে পারতো।
মেঘলা অবাক হলো।
অবাক হওয়াটা তথ্যজনিত না। অবাক হওয়াটা এই কারণে যে টপ স্টুডেন্টদের জীবনে সাধারণত একটা নিশ্চিত রেখা থাকে। তারা জানে কী করবে, কোথায় যাবে। তাদের চোখে আত্মবিশ্বাস থাকে, কিংবা অন্তত আত্মবিশ্বাসের অভিনয় থাকে। আর এই ছেলেটার চোখে মেঘলা নিশ্চিত কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। যেন সে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু থেমে নেই। যেন হাঁটে, কিন্তু গন্তব্যের নাম বলে না।
মেঘলা বলল,
তাহলে ঢাবিতে কেন?
তিথি চায়ের কাপে ফুঁ দিয়ে বলল,
বাবার অসুস্থতা। সংসারের ঝামেলা। অনেক হিসাব। তাই ফিজিক্সে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
মেঘলা আবার তাকাল।
ছেলেটার কাঁধে যেন অদৃশ্য কোনো ভার আছে। সে খুব সাধারণভাবে দাঁড়িয়ে আছে, একটু হাসছে। তবু কোথাও বিশ্রাম নেই। মেঘলা নিজের অজান্তেই ভাবল, এই মানুষটা কি কোনোদিন নিজের জন্য বিশ্রাম রাখে?
ঠিক তখন তিথি হঠাৎ জোরে ডাক দিল,
এই কবি, এদিকে আয়। তোকে চা খাওয়াবো।
ছেলেটা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। এক সেকেন্ডের জন্য যেন ভাবল ডাকটা তার জন্যই কি না। তারপর ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি নিয়ে ধীরে এগিয়ে এলো। তার হাঁটা খুব তাড়াহুড়োর না, আবার ঢিলেঢালাও না। মেঘলার মনে হলো, এই ছেলেটা সময়কে নিজের মতো করে বহন করে। সময়কে সে ধরার চেষ্টা করে না। সময়কে সে নিজের ঘাড়ে তুলে নেয়।
তিথি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
আয়, পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি।
সে মেঘলার দিকে আঙুল তুলে বলল,
এই চশমিসটা আমার বান্ধবী। নাম মেঘলা। আমরা একই ইয়ারে পড়ি। চশমিসটা সিরিয়াস টাইপের মেয়ে। স্কুলে তোকে টপকাতে পারতাম না, মেডিকেলে এসে মেঘলাকে টপকাতে পারি না। পড়ালেখায় তোরা দুইজনই ভয়ংকর মেধাবী। পার্থক্য হলো তুই কবি, আর ও সিরিয়াস।
মেঘলা একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল। চশমিস ডাকটা সে বহুদিন ধরে শুনছে। কিন্তু এই অচেনা ছেলেটার সামনে শুনতে অদ্ভুত লাগল। যেন তার পরিচয়টা এক শব্দে আটকে গেল।
নির্ঝর মেঘলার দিকে তাকাল।
তার চোখে কৌতূহল আছে, কিন্তু বিচার নেই। তুলনা নেই। শুধু এক ধরনের শান্ত দৃষ্টি, যেন সে মানুষকে দেখার অভ্যাসে অভ্যস্ত। তার দৃষ্টি এমন না যে কাউকে জেরা করে। তার দৃষ্টি এমন যে কাউকে জায়গা দেয়।
সে খুব সাধারণভাবে বলল,
ভালো লাগলো।
মেঘলা বলল,
আমারও।
কিছুক্ষণ নীরবতা। তিথি হাসতে হাসতে বলল,
আচ্ছা তোরা কথা বল। আমি একটু চা নিয়ে আসি।
তিথি একটু দূরে যেতেই নীরবতা নামল। মেঘলার বুকের ভেতরে পরিচিত অস্বস্তি উঠল। নতুন মানুষের সাথে একা হলে মেঘলা যেন নিজের শব্দ খুঁজে পায় না। সে সাধারণত নিরাপদ থাকে পড়ার মধ্যে। মানুষের মধ্যে নয়।
নির্ঝর সেটা বুঝল কি না বোঝা গেল না। সে শুধু বলল,
আপনি খুব চুপ।
মেঘলা বলল,
আমি শোনি বেশি।
নির্ঝর হালকা হাসল।
তাহলে আপনি আলাদা। বেশিরভাগ মানুষ শোনে নিজের কথা বলার সুযোগের জন্য।
এই কথাটা মেঘলাকে থামিয়ে দিল।
অবাক হওয়া মানে শুধু বিস্ময় না। অবাক হওয়া মানে নিজের মাথার ভেতরে থাকা একটা সত্যকে হঠাৎ করে অন্য কারো মুখে শোনা, আর সেই সত্যটা শুনে বুকের ভেতরে একটা আলো জ্বলে ওঠা। মেঘলা কথাটা জানত। কিন্তু কেউ কখনো এভাবে বলেনি। এভাবে বললে কথাটা শুধু কথা থাকে না, আয়নার মতো হয়ে দাঁড়ায়।
তিথি ফিরে এসে বলল,
চল, হাফওয়ালের কাছে বসি।
তারা তিনজন টিএসসি সড়কদ্বীপের হাফওয়ালের দিকে গেল। নির্ঝর হালকা লাফ দিয়ে দেয়ালের ওপর উঠে বসল। তিথিও উঠল। মেঘলা দাঁড়িয়ে রইল। দেয়ালে বসে পড়া তার স্বভাব না, আর নতুন মানুষের সামনে সে এমনিতেও অস্বস্তি পায়।
তিথি বলল,
কি হলো চশমিস, উঠবি না?
মেঘলা বলল,
না, আমি এভাবেই ভালো আছি।
নির্ঝর শান্তভাবে বলল,
যার যেখানে স্বস্তি, সেখানেই থাকা উচিত।
মেঘলা আবার অবাক হলো। কারণ কেউ সাধারণত মানুষের স্বস্তিকে গুরুত্ব দেয় না। সবাই বলে, এমন করো, ওমন করো। কেউ বলে না, তুমি যেখানে স্বস্তি পাও, সেখানেই থাকো। এই ছোট কথাটার ভেতরে একটা বড় সম্মান আছে। সম্মান মানুষকে টানে। মেঘলা সেটা বুঝতে পারল, কিন্তু বুঝেও লজ্জা পেল, এত সহজে কেন টান অনুভব হচ্ছে?
তিথি বলল,
নির্ঝর দিনে দুইটা স্টুডেন্ট পড়ায়। নিজের খরচ চালায়। আর প্রতিদিন একটা কবিতা বা ছোট গল্প লেখে।
নির্ঝর মজা করে বলল,
ওদের না পড়ালে আমার নিজের পড়াটাই বন্ধ হয়ে যাবে।
মেঘলা জিজ্ঞেস করল,
আপনি ফিজিক্স পড়েন?
নির্ঝর হাসল। হাসিটা আনন্দের না, অভ্যাসের।
হ্যাঁ। পড়ি আর ভাবি, এই সব আমার জীবনে কোনো কাজে আসবে না। এই সাবজেক্ট পড়া ঠিক হয়নি। এত জটিল জিনিস আমার ভালো লাগে না।
মেঘলা থমকে গেল।
তার চারপাশে সবাই নিজের সাবজেক্টকে পরিচয় বানায়। আর এই মানুষটা নিজের সাবজেক্টকে প্রশ্ন করছে। সে অবাক হলো কারণ তার পরিচিত পৃথিবীতে মেধাবী মানে নিশ্চিত মানুষ। আর নির্ঝর মেধাবী হয়েও অনিশ্চিত।
মেঘলা বলল,
তাহলে আপনি কেন পড়ছেন?
নির্ঝর একটু ভেবে বলল,
কারণ মাঝপথে ছেড়ে দেওয়াটাও সব সময় সাহসের না। কখনো কখনো সেটা শুধু দায়িত্ব।
মেঘলা মনে মনে বলল, দায়িত্ব। আবার দায়িত্ব। এই শব্দটা এই ছেলেটার মুখে আলাদা শোনায়। যেন দায়িত্ব মানে বোঝা না, দায়িত্ব মানে দাঁড়িয়ে থাকা।
সেদিনের বিকেলে মেঘলা বাসায় ফিরেছিল অন্যরকম একটা ভার নিয়ে। ভারটা কষ্টের ছিল না। ভারটা ছিল কৌতূহলের। তার মনে হচ্ছিল, সে যেন কারো সাথে পরিচিত হয়ে আসেনি। বরং নিজের ভেতরের একটা অচেনা প্রশ্নের সাথে প্রথমবার কথা বলে এসেছে।
আর ওই প্রশ্নটা খুব ছোট।
আমি কেন এত অবাক হচ্ছি?
পর্ব এক
অধ্যায় ২
আপনি থেকে তুমি
------------------------------
দিন যেতে লাগল। দেখা হতে লাগল। খুব পরিকল্পনা করে না। ঢাকার মতোই, হঠাৎ। কখনো মেডিকেলের গেটের সামনে। কখনো নীলক্ষেতে বইয়ের স্তূপের মাঝে। কখনো টিএসসি’র চায়ের দোকানে।
মেঘলা প্রথম দিকে নির্ঝরকে আপনি বলত। আপনি তার নিরাপত্তা। আপনি বললে সে নিজেকে দূরে রাখতে পারে। দূরে রাখাটা তার অভ্যাস। যে মেয়েরা নিয়ম মেনে বাঁচে, তারা শব্দেও নিয়ম রাখে।
নির্ঝর একদিন বলল,
আপনি বললে মনে হয় আপনি আমাকে দূরে রাখছেন।
মেঘলা বলল,
আমি অভ্যস্ত।
নির্ঝর বলল,
অভ্যাস অনেক সময় মানুষকে বাঁচায়। আবার অভ্যাসই মানুষকে আটকে রাখে।
মেঘলা আবার অবাক হলো।
কারণ সে বুঝতে পারল, নির্ঝর তার কথা বলে না শুধু, তার কথাগুলো মেঘলার মাথার ভেতর কাজ করে। সে বাসায় ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে। ভাবে, আমি কি আটকে আছি?
এই প্রশ্নটাই ভয়ংকর। কারণ প্রশ্ন আসলে শুরুর মতো। প্রশ্ন মানে বদলের সম্ভাবনা।
একদিন নীলক্ষেতে হাঁটতে হাঁটতে নির্ঝর বলল,
তুমি এত সিরিয়াস কেন?
মেঘলা বলল,
কারণ সিরিয়াস না হলে মেডিকেল হয় না।
নির্ঝর বলল,
মেডিকেল হওয়া আর মানুষ হওয়া কি এক জিনিস?
মেঘলা থমকে গেল।
সে বলল, কী মানে?
নির্ঝর বলল,
মানুষ হওয়া মানে নিজের ভেতরের ভয়, নিজের ভেতরের অহংকার, নিজের ভেতরের অভিমানকে চেনা। মেডিকেলে এগুলো শেখায় না। মেডিকেলে শেখায় রোগ চিনতে। মানুষ চিনতে শেখায় কম।
মেঘলা অবাক হলো।
তার মাথায় চকচকে একটা প্রশ্ন উঠল। মেডিকেলে আসলেই মানুষ চিনতে শেখায় না? অথচ ডাক্তার হলে তো মানুষের সামনেই দাঁড়াতে হবে। সে বলল,
তুমি এসব ভাবো কীভাবে?
নির্ঝর বলল,
কারণ আমি ঠিক জায়গায় নেই। আমি ফিজিক্স পড়ি, কিন্তু আমার মাথা মানুষের দিকে যায়। ফিজিক্সের সূত্রে আমি নিজের জীবনের সূত্র খুঁজে পাই না।
মেঘলা জিজ্ঞেস করল,
তাহলে ফিজিক্স কেন?
নির্ঝর একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
পারিবারিক কারণে। আব্বার অসুস্থতা। টাকা কম। দায়িত্ব। ফিজিক্সে ভর্তি হওয়া সহজ ছিল। আর আমি ভাবলাম, মাঝপথে যা আছে তাই মেনে নিই।
মেঘলা শুনে অবাক হলো।
কারণ সে স্কুলের টপ স্টুডেন্টদের একটা ছবি নিয়ে বড় হয়েছে। তার মাথায় ছিল, টপ স্টুডেন্টরা চায়, পায়, জিতে। আর এই টপ স্টুডেন্টটা বলছে, আমি মেনে নিয়েছি।
মেঘলা তখনো জানত না, জীবনে মেনে নেওয়া কখনো কখনো সবচেয়ে সাহসী কাজ।
তিথি এইসব শুনে একদিন হেসে বলেছিল,
চশমিস, তুই জানিস নির্ঝর চাইলে ডাক্তার হতে পারত?
মেঘলা বলেছিল,
জানি।
তিথি বলেছিল,
কিন্তু সে যায়নি। কারণ সে নিজের জীবনটা নিজের মতো করে চালাতে পারেনি। মানুষের মতো করে চলেছে।
মেঘলা তখন বুঝেছিল, প্রতিভা থাকলেই সব হয় না। প্রতিভাকে জায়গা করে দিতে হয়। জায়গা না থাকলে প্রতিভা ভেতরে ভেতরে ক্লান্ত হয়ে যায়।
আর নির্ঝরের চোখে যে ক্লান্তি, সেটা হয়তো এখানেই জন্মেছে।
একদিন টিএসসি’র হাফওয়ালে বসে নির্ঝর হঠাৎ বলল,
চশমিস, তুমি আমাকে তুমি বলে ডাকো না কেন?
মেঘলা থমকে গেল।
আপনি বলাটা তো খারাপ না।
নির্ঝর বলল,
খারাপ না। কিন্তু আপনি বললে মনে হয় তুমি এখনো আমাকে কাউকে করে করোনি। আমি তো চাই, তুমি আমাকে তোমার ভেতরে আনো।
মেঘলা চুপ করে বলল,
আমি চেষ্টা করবো।
নির্ঝর হেসে বলল,
চেষ্টা করো। তোমার চেষ্টা দেখলে আমারও মনে হয়, আমি বদলাতে পারি।
আপনি থেকে তুমি হতে এক মাস লেগেছিল। সেই এক মাসে মেঘলা বুঝেছিল, শব্দ বদলানো মানে শুধু ভাষা বদলানো না, ভেতরের দেয়ালগুলো একটু করে নামানো। আর দেয়াল নামাতে ভয় লাগে। কারণ দেয়াল না থাকলে কষ্ট সহজে ঢুকে যায়।
মেঘলা ভাবত, আমি কষ্ট নিতে পারি। আমি মেডিকেলে পড়ি। কষ্ট আমার নিত্য। কিন্তু প্রেমের কষ্ট আলাদা। প্রেমের কষ্ট শরীরের না, আত্মার।
আর মেঘলা তখনো জানত না, প্রেমের কষ্ট তাকে একদিন থামিয়ে দেবে।
পর্ব দুই
অধ্যায় ৩
চশমিসের চশমা
------------------------------
ইনকোর্স পরীক্ষার আগের রাত। হোস্টেলের ঘরটা বইয়ের গন্ধে ভরা। মেঘলা পড়ছে। টেবিল জুড়ে নোট, হাড়ের ডায়াগ্রাম, ব্লাড সার্কুলেশনের স্কেচ, নীল কালি, লাল কালি। ঘড়ির টিকটিক। বাইরে করিডোরে কারো পায়ের শব্দ। পাশের রুমে কেউ ফিসফিস করে পড়া বলছে।
মেঘলা হাত বাড়িয়ে চশমাটা নিতে গিয়ে দেখল চশমাটা নেই।
প্রথমে সে ভাবল, বিছানায় পড়েছে। তারপর টেবিল। তারপর ব্যাগ। তারপর জানালার পাশে। কোথাও নেই।
মেঘলার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। চশমা শুধু তার দেখার জিনিস না। চশমা তার ভরসা। চশমা ছাড়া অক্ষর ঝাপসা হয়, আর ঝাপসা অক্ষরের ভেতর ভয় বড় হয়ে ওঠে। এ যেন চোখের সামনে কুয়াশা নামা। কুয়াশা নামলে পথ হারায় মানুষ।
সে বিছানার নিচে হাত ঢুকাল। কিছু নেই।
মেঘলা বসে পড়ল। চোখে পানি এসে গেল। এই কান্না পড়ার জন্য না। এই কান্না অসহায়তার জন্য। কারণ সে জানে, কাল পরীক্ষা। সে জানে, পরীক্ষায় ঝাপসা চোখ মানে শুধু নম্বর কম না, ভবিষ্যৎ কম।
সে নির্ঝরকে কল দিল।
নির্ঝর ধরল।
চশমিস, কী হয়েছে?
মেঘলার গলা কাঁপছিল।
আমার চশমা নেই। আমি পাচ্ছি না। আমি কিছুই দেখতে পারছি না।
ফোনের ওপাশে এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর নির্ঝরের গলা বদলে গেল। ক্লান্ত নয়, দর্শন নয়, একেবারে বাস্তব।
কোথায় হারিয়েছে?
আমি জানি না। আমি খুঁজছি পাচ্ছি না। আমি টেনশনে পড়ে যাচ্ছি।
চশমিস, টেনশন করো না। একদম না। তুমি বসে থাকো। আমি দেখছি। সকালের আগে ম্যানেজ করবো।
মেঘলা ফিসফিস করে বলল,
কাল পরীক্ষা।
নির্ঝর বলল,
জানি। তাই তো দৌড়াচ্ছি।
রাত বারোটার পর নির্ঝর বের হলো। সে গেল পরিচিত অপটিক্যাল দোকানগুলোতে। নিউ মার্কেট, আজিমপুর, নীলক্ষেতের পাশে। সব বন্ধ। শাটার নামানো। অন্ধকার। কিছু কুকুর ঘুরছে। কিছু রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। ঢাকার রাতেরও একটা নিঃশব্দ কোলাহল আছে।
নির্ঝর আবার কল দিল।
চশমিস, আমি আছি। একটু সময় লাগবে। তুমি চোখে চাপ দিও না। আজ পড়া শেষ।
মেঘলা কাঁদছিল।
আমি ঘুমাতে পারছি না। আমি পড়তে পারছি না।
নির্ঝর বলল,
তাহলে আমি কথা বলি। তুমি শুধু শোনো। শোনলে ভয় কমে।
মেঘলা ফুঁপিয়ে বলল,
তুমি কীভাবে এত নিশ্চিত?
নির্ঝর বলল,
কারণ তুমি না দেখলে তোমার মতো মানুষ পরীক্ষা দিতে পারবে না, আর আমি সেটা হতে দেবো না। তুমি এখন শুধু শ্বাস নাও। আমি কাজ করছি।
মেঘলা অবাক হলো।
এই মানুষটা যে একটু আগেও হারিয়ে যেত, আজ সে কীভাবে এমন স্থির?
তার মাথায় একটা প্রশ্ন এল, নির্ঝর কি সত্যিই শুধু বহেমিয়ান? নাকি বহেমিয়ানের আড়ালে সে দায়িত্ব লুকিয়ে রাখে?
রাত দুইটা পেরোতেই নির্ঝরের মাথায় একটা রাস্তা খুলে গেল। পুরান ঢাকা। সেখানে এখনো এমন মানুষ আছে যারা দোকান না, কাজটাই চেনে। দোকান বন্ধ হলেও হাত চলে। টাকা না থাকলেও অনুরোধে দরজা খোলে।
নির্ঝর সোজা পুরান ঢাকার গলি ধরল।
একটা বাড়ির দরজায় টোকা দিল।
ভেতর থেকে বিরক্ত গলা,
কে?
নির্ঝর বলল,
চাচা, মাফ করবেন। খুব দরকার।
দরজা খুলল। বৃদ্ধ লোক। চোখে ঘুম। রাত তিনটা।
লোকটা বলল,
এই রাতে?
নির্ঝর হাত জোড় করল।
একটা মেয়ের পরীক্ষা। চশমা নষ্ট। আপনি না করলে সে পরীক্ষা দিতে পারবে না। আমি জানি আপনি পারেন।
লোকটা বলল,
দোকান বন্ধ।
নির্ঝর বলল,
দোকান না। মানুষ হিসেবে বলছি।
লোকটা নির্ঝরের মুখের দিকে তাকাল। ছেলেটার চোখে অনুরোধ ছিল, নাটক ছিল না। কিছুক্ষণ পরে লোকটা বলল,
প্রেসক্রিপশন আছে?
নির্ঝর ফোনে মেঘলার পুরনো প্রেসক্রিপশনের ছবি দেখাল। লোকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ঠিক আছে। নামো নিচে।
নিচের ছোট কারখানায় আলো জ্বলল। মেশিনের শব্দ। কাচ কাটা। ফ্রেম বাঁকানো। রাতের নিঃশব্দে ওই শব্দগুলো যেন আরও জোরে শোনা গেল।
নির্ঝর এক পাশে দাঁড়িয়ে রইল। সে বারবার ফোন দেখে। মেঘলা ঠিক আছে তো? সে আবার কল দিল।
চশমিস, তুমি ঘুমাও।
মেঘলা বলল,
আমি পারছি না।
নির্ঝর বলল,
তাহলে একটা গল্প শোনো। একটা মেয়ের গল্প। সে চশমা পরে, কিন্তু চশমা ছাড়াও সে মানুষকে দেখে। কষ্টকে দেখে। সাহসকে দেখে। শুধু নিজে জানে না, সে কতটা সাহসী।
মেঘলা চোখ বন্ধ করল। বুকের ভেতরটা একটু নরম হলো। এই মানুষটা কথা দিয়ে আশ্রয় বানাতে পারে। কথাগুলো তার পরিচিত পরিবেশের কারো সঙ্গে মেলে না। মেঘলার চারপাশে সবাই বলে, পড়ো, সিরিয়াস হও, ভবিষ্যৎ। আর নির্ঝর বলে, শ্বাস নাও, ভয় কমাও, তুমি সাহসী। এই কথাগুলো তাকে অবাক করে, আর সেই অবাক হওয়াটাই তাকে শক্ত করে।
চারটার দিকে চশমা তৈরি হলো। নির্ঝর চশমাটা হাতে নিল। খুব সাধারণ ফ্রেম। কিন্তু তার কাছে ওটা যেন দুনিয়ার সবচেয়ে দামি জিনিস।
ভোর পাঁচটার দিকে সে মেঘলার হোস্টেলের গেটে এসে দাঁড়াল। গেট বন্ধ। আকাশে হালকা আলো। পাখির শব্দ। রাস্তায় অল্প অল্প গাড়ি।
নির্ঝর দাঁড়িয়ে রইল।
সে দাঁড়িয়ে থাকতেই থাকল, যেন দাঁড়ানোও একটা প্রার্থনা।
ছয়টার দিকে গেট খুলল। মেঘলা বেরিয়ে এল। চোখ লাল। মুখ ফ্যাকাশে।
নির্ঝর চশমাটা এগিয়ে দিল।
চশমিস।
মেঘলা চশমাটা হাতে নিল। চোখে পরতেই চারপাশ পরিষ্কার হয়ে গেল। কিন্তু তার চোখ আরও ভিজে উঠল। পরিষ্কার চোখে সে প্রথম যে জিনিসটা দেখল, সেটা চশমা না। সেটা নির্ঝরের ক্লান্ত মুখ। রাতভর না ঘুমোনো চোখ। তবু মুখে এক ধরনের নিশ্চিন্ততা, যেন কাজটা হয়ে গেছে বলেই সে বাঁচল।
নির্ঝর বলল,
দেখতে পারছো?
মেঘলা মাথা নেড়ে বলল,
পারছি।
তারপর আর কিছু বলল না। শুধু নির্ঝরকে জড়িয়ে ধরল।
এই আলিঙ্গনে কোনো বড় কথা ছিল না। কোনো কবিতা ছিল না। ছিল ভোরের কাঁপুনি, ছিল রাতের ভয়, ছিল দায়িত্বের শান্তি।
নির্ঝর আলতো করে ধরল। মেঘলার চোখের পানি নির্ঝরের কাঁধ ভিজিয়ে দিল। নির্ঝরের চোখের পানি মেঘলার পিঠে পড়ল। ভোরের আলোয় দুইজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল। কোনো দর্শন নেই। কোনো ব্যাখ্যা নেই। শুধু উপস্থিতি।
নির্ঝর খুব আস্তে বলল,
এবার যাও। পরীক্ষা দাও।
মেঘলা কাঁপা গলায় বলল,
তুমি না থাকলে?
নির্ঝর হেসে বলল,
চশমিস, আমি থাকলেই তো তুমি দেখতে পারছো।
মেঘলা ওইদিন পরীক্ষা দিয়েছিল। তার হাত কাঁপছিল, কিন্তু চোখ দেখছিল। আর চোখ দেখলে মাথা কাজ করে। সে বেরিয়ে এসে প্রথমে তিথিকে ফোন দিয়েছিল। তিথি বলেছিল,
কী হইছে?
মেঘলা শুধু বলেছিল,
নির্ঝর রাত তিনটায় পুরান ঢাকায় গিয়ে আমার চশমা বানিয়ে আনছে।
তিথি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ছিল। তারপর বলেছিল,
এইটা বড় কথা।
মেঘলা বুঝতে পারেনি, তিথি চুপ করল কেন। পরে বুঝেছিল, তিথি নিজের ভেতরে একটা ভয়কে চুপ করিয়ে রাখছিল। ভয়টা হলো, এই মানুষটা আবার হারিয়ে গেলে মেঘলা আবার ভেঙে যাবে। আর ভাঙা মেঘলাকে তিথি দ্বিতীয়বার দেখতে চায় না।
অধ্যায় ৪
হারিয়ে যাওয়ার অভ্যাস
------------------------------
চশমার রাতটা মেঘলার মনে ছিল অনেক দিন।
এই রাতটা শুধু একটি চশমা পাওয়া না। এই রাতটা ছিল একটা প্রমাণ, নির্ঝর চাইলে দায়িত্ব নিতে পারে। আর সেই প্রমাণটাই মেঘলাকে আরও বেশি বিশ্বাসী করে তুলল।
বিশ্বাসের একটা অদ্ভুত বিপদ আছে। বিশ্বাস মানুষকে সাহস দেয়, আবার মানুষকে অন্ধও বানায়। মেঘলা যখন বিশ্বাস করল, নির্ঝর বদলে গেছে, তখন সে খুব স্বাভাবিকভাবেই ধরে নিল, এখন থেকে আর ভয় নেই।
কিন্তু মানুষ বদলায়ও, আবার পুরনো অভ্যাসে ফিরেও যায়।
বিশেষ করে যে অভ্যাসটা নিজের ভেতরের ভয় থেকে জন্মেছে, সেটা সহজে মরে না।
কিছুদিন পর নির্ঝর আবার হারিয়ে যেতে শুরু করল। প্রথমে ছোট ছোটভাবে। মেসেজের রিপ্লাই দেরি। তারপর দুই তিন ঘণ্টা। তারপর একদিন। তারপর এমন একটা রাত, যেদিন মেঘলা ক্লাস শেষ করে হোস্টেলে ফিরে দেখল, তার ফোনে কোনো উত্তর নেই।
মেঘলা প্রথমে রাগ করল না। সে নিজেকে বলল, হয়তো ব্যস্ত, হয়তো পড়াচ্ছে, হয়তো আব্বা অসুস্থ। সে জানে, মানুষের জীবন সবসময় গল্পের মতো সোজা চলে না। তবু বুকের ভেতরে একটা ছোট কাঁটা গেঁথে থাকে।
পরদিন সকালে নির্ঝর লিখল,
ভালো আছি। একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
মেঘলা লিখল,
কাল তুমি কোথায় ছিলে
নির্ঝর লিখল,
কোথাও না। মাথা ভার ছিল।
মেঘলা লিখল,
তুমি যদি মাথা ভার হয় বলো না, আমি কীভাবে বুঝব
নির্ঝর কয়েক মিনিট পর লিখল,
বোঝানোর মতো ভাষা সবসময় থাকে না, চশমিস।
মেঘলা থমকে গেল।
অবাক হলো, আবার একটু কষ্টও পেল। কারণ কথাটা একদিকে গভীর, অন্যদিকে এড়ানোর মতো। মেঘলার ভেতরে প্রশ্ন উঠল, গভীর কথা বলে কি সব এড়িয়ে যাওয়া যায়
তিথি একদিন ক্যান্টিনে বসে বলল,
চশমিস, তুই এখনো ওকে অনেক ছাড় দিচ্ছিস।
মেঘলা বলল,
ছাড় দিই না। বুঝতে চেষ্টা করি।
তিথি বলল,
বুঝতে চেষ্টা কর আর নিজের পড়া থামিয়ে দিস না। তুই ভুলে যাস না, তোর থার্ড ইয়ার ফাইনাল সামনে।
মেঘলা চুপ করে ছিল।
তার গলায় কথা আটকে ছিল, কারণ সে ভেতরে ভেতরে জানত, ফাইনাল সামনে, কিন্তু মাথার ভেতর ফাইনালের চেয়ে বড় হয়ে উঠছে নির্ঝরের অনুপস্থিতি।
এই অনুপস্থিতি খুব নির্মম। কারণ এর কোনো নির্দিষ্ট কারণ নেই। কোনো ঝগড়া নেই। কোনো বড় ঘটনা নেই। সে শুধু নেই। আর মানুষ যখন নেই হয়, তখন যারা থাকে তারা নিজেদের ভুল খুঁজতে থাকে। মেঘলা নিজের ভুল খুঁজতে লাগল।
আমি কি বেশি প্রশ্ন করছি
আমি কি বেশি আশা করছি
আমি কি বিরক্ত করছি
আমি কি আমার সিরিয়াস মুখ নিয়ে ওকে চাপ দিচ্ছি
এমন প্রশ্নের ভেতরে মানুষ ক্ষয়ে যায়।
মেঘলা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যাচ্ছিল।
থার্ড ইয়ার ফাইনালের রুটিন বের হলো। সবাই পড়ায় ডুবে গেল। হোস্টেলের করিডোরে রাত জেগে আলো। কানে কানে পড়া বলা। একেকজনের চোখে ক্লান্তি। মেঘলা পড়তে বসে, কিন্তু অক্ষরগুলো ঢোকে না। সে একই লাইন বারবার পড়ে। আবার পড়ে। আবারও পড়ে। মনে হয় মাথা ভরে আছে, কিন্তু জিনিসগুলো বসছে না।
একদিন রাত দুইটার দিকে মেঘলা ফোন হাতে নিয়ে বসে ছিল। নির্ঝরের শেষ মেসেজ দুইদিন আগের। তারপর নীরব। মেঘলা তাকে কল দিল। রিং গেল। ধরল না। আবার দিল। ধরল না। তৃতীয়বার ফোনটা কেটে গেল।
মেঘলা হঠাৎ করে খুব হাসল। হাসিটা সুন্দর না। হাসিটা ভেঙে পড়ার মতো। সে ভাবল, একজন মানুষকে খুঁজতে খুঁজতে আমি নিজের পড়াটা হারিয়ে ফেলছি। আমি একটা বছর হারালে কী হবে
এই প্রশ্নটা যখন মাথায় আসে, তখন মানুষ ভয় পায়।
আর ভয় পেলে মানুষ কখনো কখনো এমন সিদ্ধান্ত নেয়, যেটা পরে নিজেও বুঝতে পারে না, কেন নিল।
ফাইনালের আগের রাতে নির্ঝর কল দিল।
মেঘলা এক মুহূর্তে জেগে উঠল।
হ্যালো
ফোনের ওপাশে নির্ঝরের গলা শুকনো।
চশমিস
মেঘলা বলল,
তুমি কোথায় ছিলে
নির্ঝর বলল,
জানি না। আমি মাঝে মাঝে নিজেকে সামলাতে পারি না।
মেঘলা খুব ধীরে বলল,
কাল আমার পরীক্ষা।
নির্ঝর বলল,
তুমি দাও।
মেঘলা বলল,
আমি পড়তে পারিনি। আমি শুধু তোমাকে খুঁজেছি।
ফোনের ওপাশে দীর্ঘ নীরবতা। তারপর নির্ঝর বলল,
এটা করো না, মেঘলা।
মেঘলা হেসে ফেলল। হাসিটা কান্নার মতো।
আমি তোমার জন্য না। আমি আমার জন্যই থামছি। আমি নিজেকে আর খুঁজে পাচ্ছি না।
নির্ঝর বলল,
তুমি থামলে আমি নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না।
মেঘলা বলল,
তুমি আগে থাকতে। আগে থাকতে একটা মেসেজ দিতে। আমি বাঁচতাম। এখন আমার মাথা কাজ করে না।
নির্ঝর বলল,
আমি আসছি।
মেঘলা বলল,
এখন আসলে কী হবে। কাল সকাল।
নির্ঝর বলল,
আমি গেটের সামনে দাঁড়াবো। তুমি শুধু বাইরে এসো।
মেঘলা চুপ করে গেল। সে জানত, এখন বাইরে গেলে পড়া হবে না। পড়া না হলে পরীক্ষায় বসা হবে না। তবু বুকের ভেতরে একটা শিশুর মতো ইচ্ছা, আমি তাকে দেখতে চাই। আমি একবার তার চোখে তাকিয়ে বুঝতে চাই, সে সত্যি আছে।
এই টানই তাকে ডুবিয়েছে, সে তখনো বুঝতে পারেনি।
পরদিন সকাল। হোস্টেলের গেটের বাইরে নির্ঝর দাঁড়িয়েছিল। চোখ লাল। মুখ ক্লান্ত। মেঘলা বেরিয়ে এল। হাতে বই। চোখে আতঙ্ক। নির্ঝর বলল,
চশমিস, প্লিজ পরীক্ষা দাও।
মেঘলা বলল,
আমি পারবো না।
নির্ঝর বলল,
তুমি পারবে।
মেঘলা বলল,
আমি পড়তে পারিনি।
নির্ঝর বলল,
আমি কী করবো বলো।
মেঘলা তখনই একটা কথা বলেছিল, যেটা পরে সে অনেকদিন ভেবে বুঝেছিল।
আমি কাউকে ভালোবেসে নিজের জীবন থামাতে চাইনি, কিন্তু আমি থেমে গেছি। এই থামাটা এখন আমার ভেতরেই বসে আছে। আমি এটাকে টেনে নিয়ে পরীক্ষা দিতে পারবো না।
সেদিন মেঘলা পরীক্ষা দিতে যায়নি।
থার্ড ইয়ার ফাইনাল ড্রপ।
কলেজের আঙিনায় সবাই দৌড়াচ্ছে, কিন্তু মেঘলা নিজের রুমে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। বই খোলা, চোখ শূন্য। ঘড়ির কাঁটা এগোয়। আর একটা বছর তার জীবন থেকে নীরবে সরে যায়।
পর্ব চার
অধ্যায় ৫
বাড়ির নীরবতা
------------------------------
ড্রপ দেওয়ার কথা বাড়িতে লুকানো যায় না। মেডিকেলের রেজাল্টের মতোই, শেষ পর্যন্ত সত্যটা বের হয়। মেঘলা এক রাত খাবার টেবিলে বসেছিল। খেতে পারছিল না। মা মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝে গিয়েছিলেন। বাবাও।
বাবা গলা নিচু করে বললেন,
ফাইনাল ড্রপ দিয়েছিস
মেঘলা মাথা নিচু করল।
হ্যাঁ বাবা।
মায়ের হাত থেকে ভাতের থালা পড়ে যেতে যেতে থেমে গেল। তিনি কাঁদতে শুরু করলেন।
তুই জানিস আমরা কত কষ্ট করেছি
মেঘলা চুপ করে ছিল।
কষ্টের সাথে লজ্জা মিশে গেলে কথা বের হয় না।
বাবা বললেন,
কিসের জন্য করলি
মেঘলা নাম বলল না।
কারণ নাম বললে দায়টা একা নির্ঝরের ঘাড়ে যাবে। অথচ দায় তারও। ভালোবাসা ছিল, কিন্তু সীমা ছিল না।
বাবা দীর্ঘ নীরবতার পর বললেন,
ভালোবাসা জীবন থামানোর নাম না।
এই কথাটা মেঘলার মাথার ভেতর ঘুরতে লাগল। সে বুঝতে লাগল, থেমে যাওয়ার জন্য শুধু নির্ঝর দায়ী না। তার নিজের মমতাও দায়ী। সে নির্ঝরকে এতটা বাঁচাতে চেয়েছে যে নিজেকে বাঁচানোর কথা ভুলে গেছে।
মা পাশে এসে বসলেন। খুব আস্তে বললেন,
ভুল মানেই শেষ না। ভুল মানেই থেমে যাওয়া না। তুই ক্লান্ত হলে কাঁদবি। তারপর আবার দাঁড়াবি।
মেঘলা মায়ের কাঁধে মাথা রাখল।
এই কাঁধের উষ্ণতায় তার ভেতরের ভয়টা একটু নরম হলো। সে বুঝল, উদারতা শুধু প্রেমে থাকে না। উদারতা পরিবারেও থাকে। তারা কষ্ট পায়, তবু পাশে থাকে।
সেদিন রাতেই মেঘলা নিজের ডায়েরি খুলে লিখেছিল,
আমি আর কাউকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেকে হারাবো না।
আমি ভালোবাসবো, কিন্তু নিজের সীমানা রেখে।
আমি পড়া থামাবো না। আমি থামলে আমার মা কাঁদে, আমার বাবা নীরব হয়, আমার তিথি ভেঙে পড়ে, আর আমি নিজেকে আর পাই না।
এই লেখা শেষ করে সে হঠাৎ বুঝল, নিজের জন্য প্রথমবার সে নিজেই দাঁড়াচ্ছে। দাঁড়ানো মানে জেদ না। দাঁড়ানো মানে নিজের জীবনকে গুরুত্ব দেওয়া।
পর্ব পাঁচ
অধ্যায় ৬
ফিরে আসা শেখা
------------------------------
ড্রপের পর কলেজে ফেরা সবচেয়ে কঠিন।
কেউ কিছু বলে না, তবু সবাই যেন জানে। ক্লাসে ঢুকলে মনে হয় সবাই দেখছে। কেউ তাকায়ও না, কিন্তু মেঘলার মাথার ভেতরে তাকানোর শব্দ থাকে।
সে বেঞ্চের এক পাশে বসত। বোর্ডের লেখা ঝাপসা না, তবু মনে হতো ভেতরটা ঝাপসা। এটা চশমার সমস্যা না। এটা মনটার সমস্যা।
তিথি তার পাশে বসত। প্রথম দিকে তিথিও কম কথা বলত। চঞ্চল তিথি যখন চুপ হয়ে যায়, সেটা বোঝা যায় কিছু ভেতরে ভেঙেছে। একদিন ছাদে দাঁড়িয়ে তিথি বলল,
তুই জানিস, আমি এত কথা বলি কেন
মেঘলা মাথা নেড়ে বলল,
কেন
তিথি বলল,
যাতে আমার ভেতরের নীরবতা আমাকে না খেয়ে ফেলে।
মেঘলা থমকে গেল।
তিথি নিজের ভেতরটা এতটা খুলে বলে না।
তিথি বলল,
আমারও একসময় একজন ছিল। আমি ভেবেছিলাম ভালোবাসা মানে সহ্য করা। পরে বুঝেছি ভালোবাসা মানে সম্মান। তাই তোর দিকে তাকালে আমার নিজের পুরনোটা মনে পড়ে। আমি চাই না তুই ভেঙে পড়ে শক্ত হস। আমি চাই তুই ভাঙার আগেই শক্ত থাকিস।
মেঘলা তিথিকে জড়িয়ে ধরল।
সে বুঝল, বন্ধুত্বও একটা দায়িত্ব। তিথি হাসির আড়ালে দায়িত্ব নেয়। তিথি প্রেমের গল্পে চরিত্র না, তিথি মেঘলার ফিরে আসার একটা সেতু।
একদিন একজন শিক্ষক মেঘলাকে ডেকে বললেন,
তুমি ফিরে এসেছ, ভালো। মেডিসিন পড়া শুধু মেধা দিয়ে হয় না। ধৈর্য লাগে। ভুল করলে নিজেকে শাস্তি দিও না। নিজের দায়িত্ব নাও।
মেঘলা সেদিন আবার অবাক হয়েছিল। কারণ সে শাসন আশা করেছিল, পেল পথ দেখানো। মেডিকেলে সবাই কঠোর, কিন্তু কেউ কেউ কঠোরতার ভেতর মানবিক থাকে। সেই মানবিকতা একটা মানুষকে আবার উঠিয়ে দেয়।
মেঘলা উঠতে লাগল। ধীরে। খুব ধীরে।
রাতে পড়া। সকালে ক্লাস। ক্যান্টিনের ভাত। বাসার ফোনে মায়ের কণ্ঠ। বাবার ছোট ছোট প্রশ্ন, পড়া ঠিক হচ্ছে তো
আর কোথাও কোথাও নির্ঝরের নীরবতা।
নির্ঝর প্রথম দিকে ফোন করত না। হয়তো লজ্জা, হয়তো অপরাধবোধ। এক রাতে মেঘলা নিজেই তাকে মেসেজ দিল,
আমি ফিরে এসেছি। আমি পড়ছি। তুমি কেমন আছ
অনেকক্ষণ পর নির্ঝর রিপ্লাই দিল,
চশমিস, আমি ঠিক নেই। কিন্তু আমি চাই তুমি ঠিক থাকো।
মেঘলা লিখল,
তুমি ঠিক না থাকলে তুমি আমাকে বলবে। আগে থেকে বলবে। হারিয়ে গেলে নয়।
নির্ঝর লিখল,
আমি চেষ্টা করছি।
এই চেষ্টা শব্দটা মেঘলার কাছে বড় হয়ে উঠল। কারণ সে জানে, চেষ্টা মানে বদলের সম্ভাবনা।
পর্ব ছয়
অধ্যায় ৭
ঢামেকের করিডোর
------------------------------
এক রাত এগারোটায় নির্ঝর কল দিল। গলা শুকনো।
চশমিস, তুমি একটু আসতে পারবে
কোথায়?
ঢামেক। ইমারজেন্সি। আব্বাকে এনেছি। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।
মেঘলা জানে থার্ড ইয়ারে হাসপাতালের ডিউটি থাকে না। কিন্তু ঢামেক তার চেনা জায়গা। সিনিয়র আছে। পরিচিত করিডোর আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, নির্ঝর একা।
সে রিকশা নিয়ে গেল। গেটের সামনে নির্ঝর বসে আছে। হাতে কাগজপত্র। চোখে ভয়। ভয়টা ছোট নয়, ভয়টা সন্তান হারানোর ভয় নয়, বরং বাবাকে হারানোর ভয়। এমন ভয় মানুষকে একেবারে নিঃস্ব করে দেয়।
মেঘলা কাগজগুলো নিল। রিপোর্ট দেখল। সিনিয়র আপুকে ফোন দিল। ডাক্তারদের সাথে কথা বলল। কাউকে বলে বেড়াল না, আমি মেডিকেলের ছাত্রী। সে শুধু কাজ করল। পথ দেখাল। কোথায় ফর্ম নিতে হবে, কোথায় জমা দিতে হবে, কোন লাইনে দাঁড়াতে হবে, কোন ডাক্তারকে কীভাবে ধরতে হবে।
নির্ঝর ফিসফিস করে বলল,
তুমি কীভাবে এত শান্ত
মেঘলা বলল,
কারণ কাউকে না কাউকে শান্ত থাকতে হয়।
রাত তিনটার দিকে ডাক্তার বললেন অবস্থা স্থিতিশীল, ভর্তি রাখতে হবে। তখন হাসপাতালের করিডোরে আলো ফিকে। অনেক মানুষ মেঝেতে শুয়ে। কারো বালিশ নাই, কারো কম্বল নাই। ঢামেক মানুষকে শেখায়, জীবনের দাম কতটা বাস্তব।
নির্ঝর বারান্দায় দাঁড়িয়ে বলল,
আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি।
মেঘলা বলল,
জানি।
নির্ঝর বলল,
আমি কেন হারিয়ে যাই জানো
মেঘলা চুপ।
নির্ঝর বলল,
আমি ভয় পাই। আমি মনে করি আমি তোমার যোগ্য না। তুমি এত গোছানো, আর আমি ভাঙা। তাই আগে থেকেই দূরে যাই, যাতে তুমি ছেড়ে গেলে সেটা আমার নিয়ন্ত্রণে থাকে।
মেঘলা থমকে গেল।
এই অবাক হওয়াটা ছিল মানুষের ভেতরের অদ্ভুত হিসাব দেখে অবাক হওয়া। সে ভাবল, মানুষ ভালোবাসাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় কেন, যখন ভালোবাসা আসলে মুক্তি হওয়া উচিত
মেঘলা বলল,
এটা অন্যায়। কিন্তু তুমি যদি বুঝতে পারো, তাহলে বদলাতে পারো।
নির্ঝর বলল,
আমি কাউন্সেলিং শুরু করবো।
এই কথাটা মেঘলাকে আবার অবাক করল। কারণ নির্ঝর প্রথমবার নিজের ভেতরের অন্ধকারকে নাম দিয়ে ডাকতে চাইছে। নাম দিয়ে ডাকলে অন্ধকার ছোট হয়।
মেঘলা বলল,
শুধু শুরু করলেই হবে না। চালিয়ে যেতে হবে।
নির্ঝর মাথা নেড়ে বলল,
আমি চালাবো। আমি আর কাউকে ভাঙতে চাই না।
মেঘলা খুব আস্তে বলল,
আমাকে ভাঙলে তুমি নিজেকেও ভাঙো।
এই বাক্যটা নির্ঝরের ভেতর কোথাও আঘাত করল। সে চোখ নামিয়ে ফেলল।
পর্ব সাত
অধ্যায় ৮
লেখা, ভয়, আর প্রথম প্রকাশ
------------------------------
ঢামেকের রাতের পরে নির্ঝর সত্যিই বদলাতে শুরু করল। সে আর হারিয়ে গেলে চুপ থাকত না। সে লিখত, আজ আমি কথা বলতে পারছি না, কিন্তু আমি আছি। এই আমি আছি বাক্যটা মেঘলার বুকের ভেতরে একটা ঘরের মতো হয়ে গেল।
একদিন মেঘলা লাইব্রেরিতে বসে পড়ছে। হঠাৎ নির্ঝরের মেসেজ এল,
আমি একটা গল্প পাঠিয়েছি।
মেঘলা অবাক হলো।
কোথায়
নির্ঝর লিখল,
একটা অনলাইন ম্যাগাজিনে। তিথি জোর করেছে। আমি পাঠালাম।
মেঘলা লিখল,
তুমি তো বলতে তোমার লেখা কেউ ছাপবে না।
নির্ঝর লিখল,
আমি নিজেকে ছোট করে দেখতাম যাতে কেউ আমাকে বড় করে না দেখে। বড় করে দেখলে ভয় লাগত। এখন ভয় লাগে, কিন্তু আমি চাই ভয়টা আমার জীবন চালাক না।
মেঘলা থেমে গেল।
এই কথা তার পরিচিত কারো সাথে মেলে না। তার চারপাশে সবাই ভয় ঢাকে। নির্ঝর ভয়কে স্বীকার করছে। স্বীকার করার মধ্যে একটা অদ্ভুত সাহস আছে। সে আবার অবাক হলো। অবাক হওয়ার সাথে এবার তার ভেতরে এক ধরনের গর্বও হলো। যেন সে ভাবল, আমি ঠিক মানুষটার পাশে ছিলাম, কিন্তু এবার আমি নিজের জায়গা রেখেই পাশে থাকছি।
কয়েকদিন পর গল্পটা ছাপা হলো। নির্ঝর মেসেজ দিল,
ছাপা হয়েছে।
মেঘলা লিখল,
দেখেছি। তুমি কেমন লাগছে
নির্ঝর লিখল,
ভয় লাগছে।
মেঘলা লিখল,
ভয় থাকবে। কিন্তু তুমি পালাবে না।
নির্ঝর লিখল,
আমি থাকবো।
এই থাকবো শব্দটা মেঘলা অনেকক্ষণ পড়ে ছিল।
তার মনে হলো, এক বছর আগে যদি এই থাকবো শব্দটা থাকত, তাহলে তার ড্রপ লাগত না। কিন্তু জীবন পিছনে ফিরে না। জীবন শুধু সামনে যায়। সামনে যেতে গেলে মানুষকে নতুন করে শিখতে হয়।
পর্ব আট
অধ্যায় ৯
বইয়ের জন্ম
------------------------------
তিথি এবার থামল না।
একদিন টিএসসি’তে চায়ের কাপ হাতে সে বলল,
বই বের করবি।
নির্ঝর বলল,
বই? পাগল নাকি
তিথি বলল,
পাগল তো তুইই, তাই বই বের কর। তোর ভেতরের কথা বাইরে থাকুক।
মেঘলা বলল,
কিন্তু বই বের করা তো সহজ না।
তিথি বলল,
সহজ কে বলেছে। কিন্তু শুরু করলে সহজ হয়।
নির্ঝর চুপ করে ছিল।
তার চোখে আবার সেই পুরনো অনিশ্চয়তা।
মেঘলা খুব শান্তভাবে বলল,
তুমি তো বলেছিলে মাঝপথে ছেড়ে দেওয়া সবসময় সাহসের না। তাহলে এখন মাঝপথে থামবে কেন
নির্ঝর তাকাল। অবাক হলো।
চশমিস, তুমি এখন আমার কথা আমার ওপর চালাও
মেঘলা বলল,
হ্যাঁ। কারণ তোমার কথাগুলো আমি বিশ্বাস করেছিলাম। এখন তুমি বিশ্বাস করো।
তিথি হাততালি দিল।
এই কথাই তো দরকার ছিল।
বইয়ের কাজ শুরু হলো। বাস্তব কাজ। গুগল ডকে লেখা সাজানো। কোনটা কবিতা, কোনটা ছোট গল্প, কোনটা নোট। তিথি সম্পাদনা করত, কিন্তু তিথির সম্পাদনায় হাসি বেশি। মেঘলা বানান ঠিক করত, লাইনের ভুল ধরত, শব্দের মধ্যে অযথা জোর কমাত। সে ছন্দ বদলাত না। কারণ ছন্দ বদলালে লেখা ভেঙে যায়। সে শুধু লিখত, এই লাইনটা আমাকে থামিয়ে দিল।
নির্ঝর এগুলো পড়ে বলত,
তুমি কীভাবে এক লাইনে এতটা দেখতে পাও
মেঘলা বলত,
আমি ডাক্তার হতে যাচ্ছি। আমার কাজই দেখা। শুধু শরীর না, মানুষের ভয়ও দেখা।
নির্ঝর বলত,
তুমি আমার লেখার চেয়েও বড় লেখা।
মেঘলা হাসত।
আমি লেখা না। আমি দায়িত্ব।
নির্ঝর তখন চুপ হয়ে যেত। কারণ দায়িত্ব শব্দটা তার জীবনেই সবচেয়ে কঠিন।
বইয়ের নাম ঠিক হলো।
চশমিসের থেমে থাকা অবাক দৃষ্টি।
মেঘলা শুনে লজ্জা পেল। তিথি বলল,
লজ্জা পাস না। তোর অবাক হওয়াই তো এই প্রেমের বড় অংশ।
নির্ঝর খুব শান্তভাবে বলল,
চশমিস শব্দটা আমার জীবনে একটা দায়িত্বের মতো এসেছে। আমাকে মনে করিয়ে দেয় আমি কারো চোখের সামনে আছি। আমি হারিয়ে গেলে কেউ কষ্ট পায়।
মেঘলা তখন কিছু বলল না।
তার চোখ ভিজে উঠল। ভিজে উঠল, কিন্তু সে সেই ভিজে চোখ লুকাল না। কারণ এখন সে শিখেছে, সব কান্না দুর্বলতা না। কিছু কান্না হলো সত্যি হয়ে ওঠার লক্ষণ।
পর্ব নয়
অধ্যায় ১০
মুখোমুখি
------------------------------
বই প্রকাশের পর একটা নতুন ভয় এল। মেঘলার পরিবার।
একদিন বাবা বললেন,
একদিন নিয়ে আয়।
মেঘলার বুক ধক করে উঠল। সে নির্ঝরকে বলল। নির্ঝর চুপ করে বলল,
আমি ভয় পাচ্ছি।
মেঘলা বলল,
ভয় থাকলেই থাকা যায়। পালালে সমস্যা।
নির্ঝর গেল। খুব সাধারণ পোশাক। কোনো অভিনয় নেই। বাবা প্রশ্ন করলেন,
তুমি কী করো
নির্ঝর বলল,
পড়াশোনা করি। পড়াই। লিখি।
বাবা বললেন,
তুমি জানো, এই মেয়েটা একবার থেমে গিয়েছিল
নির্ঝরের গলা কেঁপে উঠল।
জানি।
বাবা বললেন,
কেন
নির্ঝর বলল,
কারণ আমি তখন উপস্থিত থাকতে পারিনি।
ঘরে নীরবতা নেমে এল।
মা চোখ মুছলেন। বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
নির্ঝর বলল,
আমি ভুল করেছি। কিন্তু আমি শিখছি। আমি কাউন্সেলিং নিচ্ছি। আমি চাই না আমার অস্থিরতা ওকে আবার ভাঙুক। আমি চাই ও এগিয়ে যাক। আমি পাশে থাকবো, কিন্তু ওর জীবন থামিয়ে না।
বাবা বললেন,
ভালোবাসা দায়িত্ব।
নির্ঝর বলল,
জানি। আর দায়িত্ব মানে সময়মতো কথা বলা, হারিয়ে না যাওয়া, ভুল করলে স্বীকার করা।
মেঘলা সেই মুহূর্তে আবার অবাক হলো।
কারণ নির্ঝর আজ তার সামনে বড় কথা বলছে না, আজ সে নিজের ভুলের সত্য বলছে। সত্য বলা সবচেয়ে কঠিন। আর নির্ঝর সেটা করছে।
পর্ব দশ
অধ্যায় ১১
প্রকাশের বিকেল
------------------------------
বই প্রকাশের দিনটা নির্ঝরের কাছে উৎসবের মতো লাগেনি।
তার কাছে দিনটা ছিল এমন, যেন সে নিজের ভেতরের একটা দরজা খুলে দিয়েছে, আর এখন যে কেউ ঢুকে পড়তে পারে। মানুষ হাততালি দেবে, এটাও ভয়। মানুষ হাসবে, এটাও ভয়। মানুষ নীরব থাকবে, এটাও ভয়। কারণ নীরবতা মানে কখনো কখনো বিচার।
সকাল থেকে নির্ঝর বারবার ফোনটা উল্টেপাল্টে দেখছিল। ম্যাসেঞ্জার খুলে বন্ধ করছিল। কী যেন লিখতে গিয়ে মুছে ফেলছিল। তার বুকের ভেতরে অদ্ভুত একটা কাঁপুনি। এই কাঁপুনি প্রেমের কাঁপুনি না। এই কাঁপুনি নিজের মুখোমুখি হওয়ার কাঁপুনি।
মেঘলা সেটা বুঝেছিল।
সে বলল,
তুমি এমন করছ কেন
নির্ঝর বলল,
মানুষ পড়বে।
মেঘলা বলল,
মানুষ তো সব সময়ই পড়ে। মানুষ শুধু বই না, মানুষ মানুষকেও পড়ে।
নির্ঝর তাকাল।
তুমি কীভাবে এত শান্ত থাকো
মেঘলা খুব ধীরে বলল,
কারণ আমি আর নিজের জায়গা ছেড়ে দিই না।
এই কথাটা নির্ঝরকে থামিয়ে দিল।
সে এক মুহূর্তে বুঝল, এই মেয়ে যে তাকে ভালোবাসে, সে তাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেকে হারাবে না। এইটাই আসলে পরিণত ভালোবাসা। এইটাই আসলে ভয়ংকরভাবে সুন্দর।
বিকেলে টিএসসি’তে ছোট করে আয়োজন হলো। বড় মঞ্চ না। মাইক আছে, কিন্তু টিভি ক্যামেরা নেই। চায়ের কাপের শব্দ আছে, কিন্তু মিডিয়ার আলো নেই। এই রকম আয়োজন নির্ঝরের মতো মানুষের জন্যই মানায়। যে বড় হয়েও ছোট থাকা পছন্দ করে, আর ছোট থেকেও গভীরভাবে বড় হয়ে ওঠে।
তিথি দৌড়াদৌড়ি করে সব সামলাচ্ছিল। এক হাতে লিস্ট, অন্য হাতে পানির বোতল। কারো সাথে হাসছে, কারো সাথে রাগ করছে। মেঘলা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। সে কাছে যায়নি। কারণ সে বুঝেছে, আজ নির্ঝরের নিজের দাঁড়ানোর দিন।
তিথি মাইক হাতে বলল,
আজকে আমরা একটা বই প্রকাশ করছি। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, আমরা একটা ভয়কে একটু ছোট করছি। এই ছেলেটা অনেকদিন লিখেছে, কিন্তু দেখাতে ভয় পেত। কারণ সে ভাবত সে যথেষ্ট না। কিন্তু যথেষ্ট হওয়া কোনো শর্ত না। আজ এই ছেলেটা শুধু লেখা প্রকাশ করছে না, সে নিজের উপস্থিতিও প্রকাশ করছে।
হালকা হাততালি উঠল।
টিএসসি’তে হাততালি খুব জোরে ওঠে না। টিএসসি হাততালি দেয়ও একটু অলসভাবে। তবু এই অলস হাততালির ভেতরে একটা উষ্ণতা থাকে। এমন উষ্ণতা, যা জোর করে নেওয়া যায় না।
নির্ঝর এগিয়ে এসে দাঁড়াল।
মাইক হাতে নিল। প্রথমে কয়েক সেকেন্ড চুপ। চোখ নামানো। তারপর চোখ উঠল।
সে বলল,
আমি সবসময় ভাবতাম, আমি ভালো লিখি না। তাই আমার লেখা কেউ ছাপবে না। তারপর বুঝলাম, আমি আসলে লেখা নিয়ে ভয় পাই না। আমি মানুষকে ভয় পাই। মানুষ পড়লে তারা আমার ভেতরের জিনিসগুলো দেখে ফেলবে, এটা আমি সহ্য করতে পারি না।
একটু থামল।
তারপর বলল,
কিন্তু আমি কাউন্সেলিং শুরু করেছি। আমি শিখছি, ভয় মানেই পালানো না। ভয় মানেই থাকা শেখা। আমি আজ এখানে দাঁড়িয়ে আছি, কারণ আমি চেষ্টা করছি। আমি জানি চেষ্টা মানেই সাফল্য না, কিন্তু চেষ্টা মানেই দায়িত্ব।
মেঘলার বুকটা কেঁপে উঠল।
সে আবার অবাক হলো। কারণ নির্ঝর আজ দর্শনের মতো কথা বলছে না, আজ সে নিজের জীবনের সত্য বলছে। জীবনের সত্য সবসময় দর্শনের থেকেও গভীর।
নির্ঝর শেষ লাইনে বলল,
এই বইটা পাতলা। কিন্তু আমার জীবনে এটা একটা দরজা। এই দরজা খুলতে পারলে আমি আরও অনেক দরজা খুলতে পারবো।
কেউ কেউ আবার হাততালি দিল।
তিথি চোখ টিপে দিল মেঘলার দিকে। মেঘলা হাসল, কিন্তু চোখ ভিজে গেল। সে নিজেকে থামাল। কারণ আজ সে কাঁদতে চায় না। আজ সে শুধু দেখতে চায়, এই মানুষটা কীভাবে নিজের ভেতরের ভয়কে ছোট করছে।
তারপর বই হাতে দিল সবাইকে।
মেঘলা যখন বইটা হাতে নিল, বইয়ের পাতায় তার নিজের নাম নেই। তবু মেঘলা বুঝল, এই বইয়ের ফাঁকে ফাঁকে সে আছে। চশমিস শব্দটার ভেতরে সে আছে। অবাক দৃষ্টির ভেতরে সে আছে। আর এই থাকা মানে শুধু প্রেম না, দায়িত্বও।
পর্ব এগারো
অধ্যায় ১২
কাউন্সেলিংয়ের ঘর
------------------------------
নির্ঝর কাউন্সেলিং নিচ্ছে শুনে মেঘলা একসময় জিজ্ঞেস করেছিল,
কেমন লাগে
নির্ঝর প্রথমে বলেছিল,
অদ্ভুত লাগে। মনে হয় আমি নিজেরই বিরুদ্ধে সাক্ষী দিচ্ছি।
একদিন নির্ঝর বলল,
আজকে কাউন্সেলর একটা কথা বলেছে।
মেঘলা বলল,
কী
নির্ঝর বলল,
সে বলেছে, তুমি মানুষকে আগে থেকে দূরে ঠেলে দাও, যাতে তারা তোমাকে ছাড়লে সেটা কম ব্যথা দেয়। এটা একটা আত্মরক্ষা। কিন্তু আত্মরক্ষার নামে তুমি আসলে নিজের কাছের জিনিসটাই নষ্ট করছ।
মেঘলা থেমে গেল।
এই কথাটা তার কানে শুধু নির্ঝরের গল্প হিসেবে ঢুকল না। এটা তার নিজের জীবনেও এসে বসে গেল। কারণ মেঘলাও কিছু কিছু জায়গায় নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে জীবনকে আটকে রাখে। শুধু তার রক্ষাটা বইয়ের আড়ালে। নির্ঝরের রক্ষাটা নীরবতার আড়ালে।
মেঘলা বলল,
তুমি কী বললে
নির্ঝর বলল,
আমি বলেছি, আমি আর কাউকে ভাঙতে চাই না। আমি চাই আমি আগে বলি, আমি ঠিক নেই। আমি চাই আমি উপস্থিত থাকি।
মেঘলা বলল,
ভালো।
নির্ঝর বলল,
ভালো মানে সহজ না। সহজ হলে এত বছর লাগত না।
মেঘলা আবার অবাক হলো।
কারণ এই ছেলেটা এখন আর “আমি ঠিক নেই” বলে হারিয়ে যাচ্ছে না, সে “আমি ঠিক নেই” বলে থাকছে। থাকা শেখা মানে এইই।
কাউন্সেলিংয়ের পর নির্ঝরের স্বভাব বদলাল। খুব নাটকীয়ভাবে না। কিন্তু ছোট ছোটভাবে। সে আগের মতো হঠাৎ করে দুই সপ্তাহ হারিয়ে থাকত না। সে লিখত, আজ আমার মাথা ভার। আজ আমি কথা বলতে পারবো না। কিন্তু আমি আছি। তুমি ভুল বুঝো না।
মেঘলা তখন আর অন্ধ হয়ে থাকত না।
সে লিখত, ঠিক আছে। বিশ্রাম নাও। কিন্তু রাতের মধ্যে একটা ছোট মেসেজ দেবে। শুধু জানাবে, তুমি আছ।
নির্ঝর লিখত, দেবো।
দেবো শব্দটা মেঘলার কাছে বড় হয়ে উঠেছিল।
কারণ একদিন এই দেবো না থাকতেই সে ড্রপ দিয়েছিল। এখন দেবো আছে, তাই সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে।
পর্ব বারো
অধ্যায় ১৩
ফিরে পাওয়া রুটিন
------------------------------
ড্রপের বছরটা মেঘলার জীবনে বড় একটা চিহ্ন হয়ে ছিল।
সে কখনো সেটা ভুলতে চায়নি। কারণ ভুলে গেলে আবার ভুল হবে। মেঘলা মেডিকেলে শিখেছে, শরীরের রোগ ভুলে গেলে রোগ ফিরে আসে। জীবনের রোগও তেমন।
সে আবার রুটিনে ফিরল।
সকালে ক্লাস। দুপুরে ক্যান্টিনের খাবার। বিকেলে লাইব্রেরি। রাতে হোস্টেলে পড়া। মাঝে মাঝে তিথির সাথে ছাদে হাঁটা। তিথি মাঝে মাঝে এমন কিছু কথা বলে, যা মেঘলাকে হাসায়, আর হাসতে হাসতে মেঘলা নিজেই বুঝতে পারে, সে আবার বাঁচছে।
তিথি একদিন বলল,
চশমিস, তোর সবচেয়ে ভালো জিনিস জানিস কী
মেঘলা বলল,
কী
তিথি বলল,
তুই পড়াশোনায় ভালো না। তুই ফিরে আসতে ভালো। সবাই পড়ে, কিন্তু সবাই পড়ে পড়ে ফিরে আসে না। তুই ফিরে আসতে পারছিস। এইটাই সাহস।
মেঘলা চুপ করে গিয়েছিল।
কারণ এই প্রশংসা তাকে লজ্জা দেয়। কিন্তু লজ্জার আড়ালে আনন্দও হয়। সে বুঝল, তার ভেতরে সত্যি একটা শক্তি আছে। যে শক্তিটা সে আগে দেখেনি।
এদিকে নির্ঝরের জীবনও বদলাচ্ছিল।
সে এখনো বহেমিয়ান। চুল এলোমেলো। শার্টটা ইস্ত্রি করা না। টাকা থাকলে চা খায়, না থাকলে হাঁটে। কিন্তু তার ভেতরের একটা জিনিস বদলাচ্ছে, সে পালানোর বদলে দাঁড়াতে চেষ্টা করছে।
সে মেঘলাকে আগের মতো ইগনোর করত না।
কখনো সে ব্যস্ত থাকত, কিন্তু এড়িয়ে যেত না। এবং এই সামান্য পার্থক্যই মেঘলার ভেতরে শান্তি আনল। কারণ মেঘলা কখনো চায়নি কেউ তাকে সবসময় সময় দিক। সে শুধু চেয়েছিল, কেউ যেন তাকে অযথা অন্ধকারে না ফেলে।
পর্ব তেরো
অধ্যায় ১৪
বাড়ির ধীরে বদলে যাওয়া
------------------------------
নির্ঝর মেঘলার বাড়িতে যাওয়ার পর মেঘলার বাবা আর আগের মতো কথা তুলতেন না।
কিন্তু নীরবতা কমে এসেছিল। মা মাঝে মাঝে ফোনে বলতেন,
খাওয়া ঠিকমতো হচ্ছে তো
পড়াশোনা ঠিকমতো হচ্ছে তো
মেঘলা বুঝতে পারত, এই প্রশ্নের ভেতরে আসলে আরেকটা প্রশ্ন লুকিয়ে আছে।
ও ছেলেটা কেমন
ও ছেলেটা আছে তো
মেঘলা নাম না নিয়ে বলত,
সব ঠিক আছে মা। আমি পড়ছি।
মা একদিন খুব আস্তে বললেন,
তোর চোখ এখন আগের মতো ভাঙা ভাঙা থাকে না।
মেঘলা থমকে গিয়েছিল।
মা কীভাবে দেখে
মা দেখে। মায়েরা সব দেখে।
চশমা থাক বা না থাক, মায়েদের চোখ অন্যরকম।
বাবা একদিন ফোনে বললেন,
এবার পরীক্ষা দিস।
মেঘলা বলল,
দেবো বাবা।
বাবা বললেন,
ভয় পাস না।
মেঘলা বলল,
ভয় আছে, কিন্তু পালাবো না।
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে বললেন,
ভালো।
এই ভালো শব্দটা মেঘলার বুকের ভেতরে জমে ছিল। কারণ বাবারা ভালো শব্দ খুব কম বলে। বাবার ভালো শব্দ মানে বড় আশ্রয়।
পর্ব চৌদ্দ
অধ্যায় ১৫
পরীক্ষার আগের রাত
------------------------------
পরীক্ষার আগের রাতটা মেঘলার জন্য নতুন একটা পরীক্ষা ছিল।
কারণ এই রাতটা তাকে তার ড্রপের রাতের কথা মনে করিয়ে দেয়। সে বই খুলে বসে, কিন্তু মাথার ভেতর পুরনো ভয়গুলো উঠে আসে। যদি আবার না পারে
যদি আবার থেমে যায়
যদি আবার কেউ হারিয়ে যায়
মেঘলা নিজের বুকের ভেতরকে শক্ত করে ধরল।
সে তিথিকে মেসেজ দিল,
আমার একটু ভয় লাগছে
তিথি রিপ্লাই দিল,
ভয় লাগা মানে তুই বেঁচে আছিস। ভয় লাগা মানে তুই সিরিয়াস। ভয় লাগা মানে তুই এখন আর বোকামি করবি না। পড়তে বস।
মেঘলা হাসল। তিথির ভাষা এমনই।
কড়া, কিন্তু ভেতরে মায়া।
নির্ঝরও কল দিল।
চশমিস, কেমন আছ
মেঘলা বলল,
ভয় লাগছে।
নির্ঝর বলল,
আমারও ভয় লাগছে। কিন্তু এবার আমি থাকবো।
মেঘলা বলল,
থাকবে মানে
নির্ঝর বলল,
তুমি ঘুমাতে যাও। আমি ফোনটা হাতে রাখবো। তুমি যদি জেগে উঠো, শুধু একটা মেসেজ দেবে। আমি রিপ্লাই দেবো। তুমি জানবে, আমি আছি।
মেঘলার চোখ ভিজে উঠল।
এই ছোট উপস্থিতিটা একদিন না থাকতেই সে ভেঙে পড়েছিল। আজ এটা আছে। তাই সে ভাঙছে না।
সে খুব আস্তে বলল,
তুমি এখন অনেক বদলে গেছ।
নির্ঝর বলল,
বদল না হলে আমি মানুষই থাকতাম না, চশমিস।
মেঘলা আবার অবাক হলো।
এই অবাক হওয়া ছিল পরিণত অবাক হওয়া। অবাক হওয়া মানে এবার মুগ্ধতা নয়, অবাক হওয়া মানে সম্মান।
পর্ব পনেরো
অধ্যায় ১৬
আবার দাঁড়ানো
------------------------------
মেঘলা পরীক্ষা দিল।
একটা, তারপর আরেকটা। দিনগুলো কাটল। মাথার ভেতর চাপ, শরীরের ভেতর ক্লান্তি, তবু সে থামল না। তার চোখে আবার সেই পুরনো স্থিরতা ফিরল, যেটা একসময় ছিল। শুধু পার্থক্য হলো, এবার স্থিরতার ভেতর একটা নরমতাও আছে। আগে সে নিজেকে গড়ে তুলত কঠোরতা দিয়ে। এবার সে নিজেকে গড়ে তুলছে দায়িত্ব দিয়ে।
পরীক্ষার শেষ দিন মেঘলা বেরিয়ে এসে হোস্টেলের গেটের বাইরে দাঁড়াল।
নির্ঝর একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। হাতে দুই কাপ চা। চুল এলোমেলো, শার্টটা ঠিকমতো গোঁজা না। তবু তার চোখে একটা আলো, যেটা মেঘলা আগে দেখেছে খুব কম। এটা নিশ্চিন্ততার আলো।
নির্ঝর এগিয়ে এসে বলল,
চশমিস, কেমন হলো
মেঘলা বলল,
ভালো।
নির্ঝর হেসে বলল,
ভালো মানে সত্যি ভালো, নাকি তোমার সিরিয়াস ভালো
মেঘলা হেসে ফেলল।
এই হাসিটা অনেকদিন পর। বুকের ভেতর থেকে বের হওয়া হাসি।
সে বলল,
সত্যি ভালো।
নির্ঝর চা এগিয়ে দিল।
তাহলে আমরা এবার একটু হাঁটি।
তারা হাঁটল। মেডিকেলের গেট থেকে বেরিয়ে রাস্তায়। ঢাকার রাস্তা। মানুষের ভিড়। হর্ন। রিকশা। কিন্তু তাদের মাঝখানে একটা শান্ত করিডোর যেন তৈরি হলো। মেঘলা বুঝল, শান্তি মানে শব্দ না থাকা না। শান্তি মানে শব্দের ভেতরেও নিজেকে পাওয়া।
পর্ব ষোল
অধ্যায় ১৭
দ্বিতীয় আলিঙ্গনের আগে
------------------------------
কিছুদিন পরে বইটা আবার আলোচনায় এল।
অনেকেই পড়ল। কেউ ইনবক্স করল নির্ঝরকে। কেউ বলল, লেখা ভালো। কেউ বলল, এই লাইনটা আমাকে থামিয়ে দিয়েছে। নির্ঝর প্রথম দিকে ভয় পেত। তারপর ধীরে ধীরে সে শিখল, প্রশংসা মানে বিপদ নয়। প্রশংসা মানে দায়িত্ব। কারণ মানুষ যদি তোমাকে পড়ে, তোমাকে বিশ্বাস করে, তখন তোমারও দায়িত্ব হয় মানুষকে সম্মান করার।
মেঘলা দেখল, নির্ঝর বদলাচ্ছে।
সে এখনো বহেমিয়ান, কিন্তু তার বহেমিয়ানে এখন একটা নরম শৃঙ্খলা ঢুকেছে। সে এখনো জটিল সাবজেক্টকে ভালোবাসে না, কিন্তু জীবনের জটিলতা সে এড়িয়ে যায় না।
একদিন টিএসসি’তে হাফওয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে নির্ঝর বলল,
চশমিস, আমি এখন আর বিশ্ব জয় করার কথা ভাবি না।
মেঘলা বলল,
কেন
নির্ঝর বলল,
কারণ বিশ্ব জয় করতে গিয়ে মানুষ অনেক সময় নিজের কাছের মানুষকে হারায়। আমি এখন চাই, আমি নিজের ভেতরের ভয়কে সামলাতে পারি। আমি চাই আমি তোমাকে ঠিকভাবে ভালোবাসতে পারি। এইটাই আমার সবচেয়ে বড় জয়।
মেঘলা থেমে গেল।
তার বুকের ভেতরে একসাথে কষ্ট আর আনন্দ মিশল। কষ্ট, কারণ সে মনে করল ড্রপের বছরটা। আনন্দ, কারণ সে দেখল, নির্ঝর সেটা বুঝেছে। বোঝা মানে ক্ষমা পাওয়া না, বোঝা মানে বদলানোর রাস্তা খোলা।
মেঘলা খুব আস্তে বলল,
আমি একদিন তোমাকে বিশ্বাস করে নিজের জীবন থামিয়ে দিয়েছিলাম।
নির্ঝর চোখ নামাল।
মেঘলা বলল,
আমি জানি সেটা শুধু তোমার দোষ না। আমারও দোষ। আমি তোমাকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেকে হারিয়েছিলাম।
নির্ঝর খুব ধীরে বলল,
আমি চাই না তুমি আর কখনো নিজেকে হারাও।
মেঘলা বলল,
আমি হারাবো না। কিন্তু তুমি যদি হারাও, আমি তোমার পাশে থাকবো। নিজের জায়গা রেখে।
এইখানে নির্ঝর চুপ করে গেল।
এই চুপের মধ্যে সে নিজের ভেতরের পুরনো নির্ঝরকে দেখল, যে পালাত। আর নতুন নির্ঝরকে দেখল, যে থাকার চেষ্টা করছে।
সে বলল,
আজ আমি এখানে আছি।
পর্ব সতেরো
অধ্যায় ১৮
তোমার পিঠে পড়া কান্না
------------------------------
হাফওয়ালের পাশে বিকেলের আলোটা সেদিন অদ্ভুতভাবে নরম ছিল।
ঢাকা নিজের মতোই ব্যস্ত।
চায়ের কাপের শব্দ, মানুষের হাঁটা, কোথাও কোনো তাড়া নেই আবার সবখানেই তাড়া।
মেঘলা দাঁড়িয়ে ছিল।
নির্ঝর তার সামনে।
অনেক কথা বলা হয়ে গেছে।
অনেক না বলা কথাও।
নির্ঝর খুব আস্তে বলল,
চশমিস, আমি একদিন তোমার জন্য উপস্থিত থাকতে পারিনি।
মেঘলা কিছু বলল না।
সে জানে, কিছু সত্যের কোনো জবাব লাগে না।
নির্ঝর আবার বলল,
তুমি তখন থেমে গিয়েছিলে। আমি জানতাম না থেমে যাওয়া কতটা গভীর ক্ষত।
মেঘলার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
এই কাঁপুনিটা কান্না না।
এই কাঁপুনিটা বহুদিন ধরে ধরে রাখা ভারের নড়াচড়া।
মেঘলা খুব ধীরে বলল,
আমি তখন কাউকে দোষ দিইনি। আমি শুধু নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম।
নির্ঝর এক পা এগিয়ে এল।
কোনো তাড়া নেই।
কোনো দাবি নেই।
সে শুধু বলল,
আমি আজ এখানে আছি।
এই আছি শব্দটা মেঘলার বুকের ভেতরে কোথাও খুলে গেল। যে জায়গাটা এক বছর ধরে বন্ধ ছিল।
মেঘলার চোখ ভিজে উঠল।
সে আর ধরে রাখল না।
নির্ঝর তাকে বুকে টেনে নিল।
এই আলিঙ্গনটা আগেরটার মতো ভাঙা না।
এই আলিঙ্গনটা ছিল ভারী, কিন্তু স্থির।
মেঘলার চোখের পানি নির্ঝরের পিঠে পড়ল।
চুপচাপ।
নিঃশব্দে।
নির্ঝরের চোখের পানি মেঘলার কাঁধ ভিজিয়ে দিল।
কেউ কাউকে দেখল না।
কেউ কাউকে লুকাল না।
দুজনের কান্না একে অপরের শরীরে মিশে গেল।
কষ্ট আর আনন্দ আলাদা করা গেল না।
কারণ কোনো কোনো কান্না শুধু দুঃখের না, কোনো কোনো কান্না বড় হয়ে যাওয়ার।
অনেকক্ষণ তারা আলাদা হলো না।
ঢাকা চলছিল।
সময় চলছিল।
কিন্তু তারা দাঁড়িয়ে ছিল।
নির্ঝর খুব আস্তে বলল,
আমি তোমাকে হারাতে চাই না।
মেঘলা একইভাবে আস্তে বলল,
আমি আর নিজেকে হারাতে চাই না।
নির্ঝর তাকে আরেকটু শক্ত করে ধরল।
এই শক্ত করে ধরা ছিল না আঁকড়ে ধরা।
এটা ছিল পাশে থাকার প্রতিজ্ঞা।
মেঘলা বুঝল,
ভালোবাসা মানে কাউকে নিজের সব দেওয়া না।
ভালোবাসা মানে নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে কারো হাত ধরা।
হাফওয়ালের পাশে আলো ধীরে ধীরে ফিকে হলো।
কিন্তু মেঘলার ভেতরে আলো জ্বলে উঠল।
নির্ঝর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
মানুষ বিশ্ব জয় করে না। মানুষ নিজের ভেতরের ভয়কে সামলাতে পারলে, সেটাই সবচেয়ে বড় জয়।
মেঘলা আবার অবাক হলো।
কিন্তু এবার তার অবাক হওয়ায় কোনো কষ্ট নেই।
এই অবাক হওয়া শান্ত।
এই অবাক হওয়া পরিণত।
এই অবাক হওয়া ভালোবাসা।
তিথি দূর থেকে এসে বলল,
এই কী, তোরা আবার চোখ লাল করেছিস নাকি
মেঘলা হাসল,
ধুলো পড়েছে।
তিথি বলল,
টিএসসি’তে এত আবেগের ধুলো কোথা থেকে আসে
নির্ঝর হেসে বলল,
ঢাকায় ধুলো সব জায়গায়ই থাকে। শুধু কিছু ধুলো চোখে লাগে, কিছু ধুলো মনে লাগে।
তিথি বলল,
থাম, আবার দর্শন শুরু করলি।
তিনজন হাসল।
মেঘলা বুঝল, শেষ মানে সব সমস্যার শেষ না। শেষ মানে এই সিদ্ধান্ত, যে তারা সমস্যার ভেতর দিয়েও হাঁটবে। পালিয়ে নয়। একে অপরকে ভেঙে নয়। পাশে থেকে। দায়িত্ব নিয়ে। উদার হয়ে। নিজেদের জীবনকে সম্মান করে।
চশমিসের অবাক দৃষ্টি সেদিন শুধু নির্ঝরের দিকে তাকিয়ে ছিল না।
সেই দৃষ্টি এবার নিজের দিকেও তাকিয়েছিল।
যেন বলছিল, আমি থেমে যাইনি। আমি ফিরে এসেছি। আমি এখন ঠিকভাবে চলতে শিখছি।
তিথির দৃষ্টিতে
টিএসসি’তে বিকেল নামলে আমি সবসময় প্রথমে লোকজন দেখি না। আমি প্রথমে আলো দেখি। এই জায়গার আলো এক ধরনের। ঢাকা শহর যত কোলাহলই করুক, টিএসসি’র আলো কখনো কখনো মানুষের ভেতরের শব্দগুলোকে থামিয়ে দেয়। সেদিনও থামিয়েছিল।
আমি দূর থেকে ওদের দেখছিলাম। খুব কাছে যাইনি। কাছাকাছি দাঁড়ালেই আমি কথা বলে ফেলি, হাসি দিয়ে ফেলি, আর মানুষের ব্যক্তিগত মুহূর্তটাকে আমি নিজের অজান্তেই হালকা করে দিই। সেই দিনটা হালকা করার দিন ছিল না। সেই দিনটা ছিল ভারী কিছুকে নামিয়ে রাখার দিন।
মেঘলা যখন নির্ঝরকে জড়িয়ে ধরল, আমি ঠিক বুঝে গিয়েছিলাম এটা প্রথমবারের আলিঙ্গন না। প্রথম আলিঙ্গন ছিল ভয়ের। এই আলিঙ্গনটা ছিল থাকা শেখার। একটা মানুষকে বুকে জড়িয়ে ধরার মধ্যে শুধু প্রেম থাকে না, অনেক সময় একটা জীবনও থাকে। আমি দূর থেকে দেখেছিলাম, মেঘলার চোখের পানি নির্ঝরের পিঠ ভিজিয়ে দিল। আর নির্ঝরের চোখের পানি মেঘলার কাঁধ। আমি জানতাম, এই কান্না দুঃখের কান্না না। এই কান্না হলো জমে থাকা এক বছরের হিসাব মিটিয়ে ফেলার কান্না। যেটা না কাঁদলে মানুষ ভেতরে ভেতরে শক্ত হতে হতে পাথর হয়ে যায়।
আমি মেঘলাকে চিনি অনেকদিন। ঢাকা মেডিকেলে ঢোকার দিন থেকেই চিনি। ওর চোখে তখনও সিরিয়াসনেস ছিল, কিন্তু সেই সিরিয়াসনেসের ভেতরে একটা গোপন কোমলতাও ছিল। মেঘলা সবসময় মনে করত শক্ত থাকতে হবে। মেডিকেলে শক্ত না থাকলে চলবে না। রোগীর সামনে কাঁদা যায় না, পরীক্ষার আগে ভেঙে পড়া যায় না, বাড়ির কষ্ট নিয়ে ক্লাসে ঢোকা যায় না। মেঘলা সেইসব “যায় না” খুব ভালো জানে। কিন্তু আমি জানতাম, ওর ভেতরে একটা জায়গা আছে, যেটা “যায় না” মানে না। ওর ভেতরে একটা জায়গা আছে, যেটা বিশ্বাস করতে চায়, মানুষ বদলাতে পারে। মানুষ ঠিক হতে পারে।
নির্ঝরকে আমি স্কুল থেকেই চিনতাম। মেধাবী ছিল। এতটাই মেধাবী যে ক্লাসের স্যাররা ওকে দেখিয়ে বলতেন, এ ছেলে একদিন বড় কিছু হবে। বড় কিছু হওয়া মানে আমরা তখন ভাবতাম ডিগ্রি, চাকরি, বিদেশ, পুরস্কার। কিন্তু নির্ঝর বড় কিছু হওয়ার আগেই ছোট একটা জীবনের ভেতরে আটকে গেল। বাবার অসুস্থতা, টাকার টান, দায়িত্বের ওজন। ও চাইলে ডাক্তার হতে পারত, ইঞ্জিনিয়ার হতে পারত, কিন্তু হলো না। ঢাবিতে ফিজিক্স পড়ল, আর একই সাথে নিজের ভেতরের অনিশ্চয়তা বয়ে বেড়াল।
আমি নির্ঝরকে “কবি” বলে ডাকি মজা করে, কিন্তু সত্যটা হলো, ওর কবিতা শুধু কাগজে না, ওর জীবনেও আছে। সমস্যা হলো, ওর কবিতার বেশিরভাগ লাইন ছিল পালিয়ে যাওয়ার লাইন। ও মাঝে মাঝে হারিয়ে যেত। কারও কাছে ব্যাখ্যা করত না। নিজেও বুঝত না কেন করে। আমি এটা দেখে বিরক্ত হতাম। রাগ হত। কারণ আমি জানতাম, মেঘলা এমন মেয়ে যে একবার কাউকে বিশ্বাস করলে নিজের পড়া, নিজের ঘুম, নিজের খাবার সব ভুলে যেতে পারে। আর সেই ভুলটাই তাকে থামিয়ে দিয়েছিল। থার্ড ইয়ার ফাইনাল ড্রপ। একটা বছর। একটা বয়স। একটা আত্মবিশ্বাস। সবকিছু যেন হঠাৎ থমকে গিয়েছিল।
ড্রপের সময় আমি ভেতরে ভেতরে ভয় পেয়েছিলাম। ভাবতাম, মেঘলা আর ফিরতে পারবে না। কারণ অনেক মানুষ পড়া ছেড়ে দেয় না, তারা নিজেদেরই ছেড়ে দেয়। কিন্তু মেঘলা ফিরেছিল। ধীরে ধীরে। কাঁদতে কাঁদতে। মায়ের কাঁধে মাথা রেখে। বাবার নীরবতা সহ্য করে। আর নিজের ভেতরে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে, যে সিদ্ধান্তটা আমি কখনো ভুলবো না। ও একদিন আমাকে বলেছিল, আমি আর কাউকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেকে হারাবো না।
এই একটা বাক্যেই আমি বুঝেছিলাম, মেঘলা বড় হচ্ছে। আর বড় হওয়া মানে শুধু বয়স না। বড় হওয়া মানে সীমা জানা। বড় হওয়া মানে নিজের জায়গা ধরে রাখা। বড় হওয়া মানে ভালোবাসাকে দায়িত্বের ভেতরে নেওয়া।
আর নির্ঝরও বদলেছিল। আমি প্রথমে বিশ্বাস করিনি। আমি ভাবতাম, এই ছেলেরা বদলায় না। এরা দর্শন করে, কবিতা লেখে, কিন্তু দায়িত্ব নিতে ভয় পায়। কিন্তু নির্ঝর কাউন্সেলিং শুরু করল। নিজের ভুল স্বীকার করল। “আমি ঠিক নেই” বলে পালাল না। “আমি ঠিক নেই” বলে থাকল। এই থাকাটাই আসল বদল। এই থাকাটাই মেঘলাকে আবার নিরাপদ করল।
যখন নির্ঝরের বই বের হলো, আমি জানতাম এটা শুধু লেখার বই না। এটা তার উপস্থিতির বই। যে মানুষটা নিজের জীবনকে দেখাতে ভয় পেত, সে আজ নিজের ভাঙা জায়গাগুলোকে নাম দিয়ে ডাকতে শিখছে। আর যে মেয়ে একদিন এই ছেলের জন্য থেমে গিয়েছিল, সে আজ এই ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনও এগিয়ে নিচ্ছে। এটাই আমার কাছে প্রেমের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। প্রেম যদি কাউকে থামিয়ে দেয়, সেটা প্রেম না, সেটা আসক্তি। প্রেম যদি কাউকে এগিয়ে দেয়, সেটা প্রেম। আর প্রেম যদি দুজনকে একসাথে বড় করে তোলে, সেটা আশীর্বাদ।
সেদিন ওদের আলিঙ্গনের পরে আমি কাছে গিয়ে বলেছিলাম, ধুলো পড়েছে নাকি। আমি জানতাম ধুলো না। আমি জানতাম এটা কান্না। কিন্তু মানুষ সবসময় কান্নাকে নাম দিতে চায় না। কান্না নামহীন থাকলে বেশি সত্যি থাকে।
আমি এখনো মাঝে মাঝে টিএসসি’তে বসে থাকি। চায়ের কাপ সামনে। চোখ চলে যায় হাফওয়ালের দিকে। মনে হয়, কিছু জায়গা শহরের মতো না, কিছু জায়গা জীবনের মতো। এখানে মানুষ এসে শুধু চা খায় না, মানুষ এসে নিজের ভেতরের ভার নামিয়ে রাখে।
মেঘলা আর নির্ঝর সেই দিন থেকে সব সমস্যামুক্ত হয়ে গেছে, এমন না। জীবন কাউকে ছাড়ে না। কিন্তু তারা এখন পালায় না। তারা এখন কথা বলে। তারা এখন দায়িত্ব নেয়। তারা এখন জানে, ভালোবাসা মানে একে অপরকে বাঁচানোর চেষ্টা করা, কিন্তু নিজের জায়গা রেখে।
আর আমার?
আমি এখনো আগের মতোই চঞ্চল। কথা বলি। হাসি। সবাইকে ডাকি। “এই কবি, এদিকে আয়।” “এই চশমিস, সিরিয়াস কম কর।”
কিন্তু ভেতরে ভেতরে আমি শান্ত থাকি। কারণ আমি জানি, আমার দুই বন্ধু ঠিকভাবে হাঁটতে শিখছে।
কখনো কখনো আমি ভাবি, স্কুলের সেই ছেলেটা, যে চাইলে ডাক্তার হতে পারত, ইঞ্জিনিয়ার হতে পারত, সে শেষ পর্যন্ত কী হলো?
সে হয়তো বিশ্ব জয় করেনি।
কিন্তু সে নিজের ভেতরের ভয়কে জয় করেছে।
আর আমার কাছে, এইটাই সবচেয়ে বড় জয়।
আর মেঘলা?
মেঘলা এখনো চশমিস।
কিন্তু তার অবাক দৃষ্টি এখন আর থেমে থাকে না।
তার অবাক দৃষ্টি এখন এগোয়।
0 Comments