যে জীবন আমার, সেটাতো চাইনি আমি




যে জীবন আমার, সেটাতো চাইনি আমি।

তবু এই জীবনই প্রতিদিন এসে দাঁড়ায়,

নিঃশব্দে বলে,

ফিরে যাওয়ার কোনো পথ আর নেই।

 

আমিতো হাওয়ার মতো থাকতে চেয়েছিলাম,

হাওয়ারা যেমন আপন মনে

বয়ে যায় এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে

শুধু পথের সাথে, একটু রোদে, একটু বৃষ্টিতে।

 

যে জীবন আমার, সেটাতো চাইনি আমি।

আমিতো চেয়েছিলাম পাগলামী ভরা রাত,

বাউন্ডুলে দিন, স্বেচ্ছাচারী জীবন।

অথচ আমার ডানায় বেধে রাখা ভারী পাথর।

 

যাদের চোখে একদিন আগুন দেখেছিলাম,

আজ তাদের চোখে কেবল আয়না।

নিজেকে ছাড়া

আর কাউকে সেখানে দেখা যায় না।

 

অভিমানও কোথায় যেন চলে গেছে।

যেমন চলে যায় নদী,

পিছনে রেখে যায় শুধু

ভেজা মাটি, শুকনো শেওলা।

 

মাঝে মাঝে মনে হয়,

আমি কি সত্যিই ভুল জীবনে ঢুকে পড়েছি?

নাকি এটাই আমার জীবন,

আমিতো কোনোদিনই তাকে নিজের বলে মানিনি!

 

যে জীবন আমার, সেটাতো চাইনি আমি।

তবু এই জীবনই আমার একমাত্র ঠিকানা।

তাই প্রতিটি সকালকে সন্দেহ করি,

প্রতিটি রাত আসে অবিশ্বাস নিয়ে।

 

আর ভোর হলে,

নিজের ছায়াটাকে পাশে নিয়ে হাঁটি।

কোথাও কেউ অপেক্ষা করে না

এ কথা জেনেও হাঁটি।

কারণ থেমে যাওয়ার চেয়ে,

হেঁটে যাওয়াই আমার শেষ স্বাধীনতা।

#


অপেক্ষা করো

 

অপেক্ষা করো কুষ্টিয়া, গড়াই নদীর বাতাস।

অপেক্ষা করো বড়বাজার, শিউলি ফুলের সুবাস।
আমি ফিরব। ফিরব ধুলোঝড়, বর্ষা, দীর্ঘ পথ পেরিয়ে।
ফিরবো বলেই তোমার গন্ধ রেখেছি বুকে জড়িয়ে।
অপেক্ষা করো ছেঁউড়িয়ার নিশীথরাত, একতারা আর দূরের সুর।
বুকের ভেতরে তোলপার করা গান, রাতজাগা বাতাসে সুমধুর।
আমি ফিরব। ফিরব লালন আখড়া, তোমার গান কুড়িয়ে নিতে।
বহুদিনের ভাঙা স্বপ্ন আটকে আছে আমার পুরোনো স্মৃতিতে।

অপেক্ষা করো শিলাইদহ কুঠিবাড়ি, রেনউইক বাঁধের আলো।
তোমার চোখে রেখে আসা, আমার সেই পুরোনো ভালো।
আমি ফিরব। ফিরব কবিতার কাছে, মানুষের কাছে, নিজের কাছে।
আমার বুকের নিঃশব্দ নদী আজও তোমার জন্য বাঁচে।
অপেক্ষা করো তুমি, সেই নীল শাড়ি, ছোট্ট টিপ, জানালার পাশে ছায়া।
যার চুলে নামতো সোনালী বিকেল, সন্ধ্যা, যার নামজুড়ে এতো মায়া।
আমি ফিরব। হারানো সব আদর তোমায় ফিরিয়ে দিতে।
তোমার উঠোনে, শিউলি গাছের নিচে, চুলের গন্ধ নিতে।
অপেক্ষা করো আমার প্রথম স্পর্শ, প্রথম লজ্জা, প্রথম হাত ধরা।
অপেক্ষা করো কলেজ মাঠ, কোমল হাতের ছোঁয়ায় দিশেহারা
আমি ফিরব। ফিরব তোমার কাছে, আমার সেই পুরোনো ঠিকানা।
হে প্রিয়তমা, তোমাকে ছাড়া আমার আর বেঁচে থাকা মানা।
শোনো শিলাইদহ, কুষ্টিয়ার পথঘাট, পুরোনো বৃক্ষ, জনপদ।
আমি ফিরব। ফিরবই একদিন, এ আমার গোপন শপথ।

অন্ধকারে ধসে পড়া ঘর


রাত অনেক হলে

মানুষ নিজের কাছেই ফিরে আসে।
বাইরের পৃথিবী তখনও জেগে থাকে।
আলো জ্বলে।
গাড়ি যায়।
কারো জানালায় গান বাজে।
আমি চুপ করে বসে থাকি।
মনে হয় বুকের ভিতর
একটা পুরোনো নদী
শুকিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
কেউ তা টের পায় না।
পাওয়ার কথাও না।
দিনভর মানুষ আমাকে দেখে
হাসতে দেখে
ব্যস্ত থাকতে দেখে।
মনে করে
আমি বোধহয় জীবনের সঙ্গে ঠিকঠাক তাল মিলিয়ে চলছি।
শুধু আমি জানি
ভিতরে ভিতরে কত শব্দ ভেঙে পড়ে।
কিছু অপমান জমে থাকে।
কিছু বিকেল ডুবে যায়।
কিছু মুখ হঠাৎ অচেনা হয়ে ওঠে।
আর কিছু ভালোবাসা
একদিন কোনো শব্দ না করেই থেমে যায়।
গভীর রাতে
সেইসব ভাঙার শব্দ শোনা যায়।
খুব ব্যক্তিগত সেই শব্দ।
যেন একা একটা ঘর ধসে পড়ছে অন্ধকারে
আর ধুলোর ভিতর
দাঁড়িয়ে আছে শুধু আমার ছায়া।
এই নীরবতারও একটা শরীর আছে।
সে পাশে এসে বসে থাকে।
কিছু জিজ্ঞেস করে না।
শুধু আমার সমস্ত না বলা কষ্ট
ধীরে ধীরে
পাথরের মতো জমতে থাকে।