রাত তখন প্রায় দেড়টা। কেবল চোখে কায়দামতো ঘুম এসেছে। এমন সময় মোবাইলে কল। একবার। দুইবার। তিনবার। চোখ কচলায়ে ফোন হাতে নিলাম। স্ক্রিনে রিপনের নাম দেখে বুক ধক করে উঠলো। এই ছেলে রাত দুইটার পর ফোন দেয়। তার কল মানেই ধরা খাওয়া। হয় সে প্রেমে ধরা খাইছে, না হয় পুলিশে ধরা খাইছে।
ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে চাপা গলা। দোস্ত... আমি শেষ। আমি ধড়মড় করে উঠে বসলাম। জিগাইলাম, কি হইছে? সে কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকলো। তারপর বললো, আমি মুনিয়ারে বিয়া করছি।
আমি চোখ বন্ধ করলাম। মনে মনে আয়াতুল কুরসি পড়ে ফেললাম।
ওই মুনিয়া? যার ভাই জিম করে আর ফেসবুকে কেজিএফের ছবি পোস্ট করে? রিপনের গলা কাঁপতেছিল। হ।
তুই এখন কোথায়?
ছাদে।
ছাদে কি করস?
পানির ট্যাংকের ভেতর লুকায়া আছি।
আমি কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকলাম। তারপর বললাম, পুরা ঘটনা খুলে বল।
রিপন দীর্ঘশ্বাস ফেললো। আজকে বিকালে আমরা কাজি অফিসে বিয়া করছি। তারপর মুনিয়া কইলো, বাসায় না দিলে সন্দেহ করবো।
আমি মাথায় হাত দিলাম। মানে তুই বিয়া কইরা আবার শ্বশুরবাড়িতে বউ ডেলিভারি দিতে গেছস?
রিপন প্রায় কেঁদে ফেললো। আমি ভাবছিলাম সিনেমার মতো হবে।
তারপর কি হইলো?
আমি আর মুনিয়া বাসায় কলিংবেল দিলাম। হঠাৎ নিচতলার সিঁড়িতে দেখি মুনিয়ার ভাই। সে চিৎকার করে কইলো, শালারে ধর! আমি আগপাছ না দেখে সিঁড়ি দিয়ে ছাদে পালাইছি। এখানেও খুঁজছে। ট্যাংকির ভেতরে নামছিলাম। তাই খুঁজে পায় নাই।
আমি হাসি চাপা রাখতে পারলাম না। হেসে ফেললাম। কয়েক সেকেন্ড চুপ থাকলাম। তারপর বললাম, কত সময় পানির ট্যাংকে আটকে আছিস? বলেই আমি আবার হেসে ফেললাম। সে কাঁদো কাঁদো গলায় বললো, দোস্ত, মজা করিস না। নিচে ওরা লাঠি নিয়্যা খুঁজতেছে।
আমি তাড়াতাড়ি টি শার্ট গায়ে দিলাম। জীবনে বহু আজব কাজ করছি। বন্ধুর প্রেমপত্র লিখে দিছি। মারামারি থামাইছি। বন্ধুর অভিভাবক হয়ে ইউনিভার্সিটিতে প্রক্সি দিছি। কিন্তু সদ্য বিয়ে করা বন্ধুকে পানির ট্যাংকের আড়াল থেকে উদ্ধার করতে যাওয়া, এটা প্রথম।
আমি সঙ্গে সঙ্গে রকি ভাইকে ফোন দিলাম। রকি ভাই আমাদের এলাকার কিংবদন্তি মানুষ। উনি একই সাথে পাঁচটা জিনিস হতে পারেন। মুরব্বি। রাজনৈতিক বিশ্লেষক। মারামারি বিশেষজ্ঞ। বিয়ে সালিশকারী। এবং প্রয়োজনে দার্শনিক। সব শুনে উনি শুধু বললেন, ঠিকানা পাঠা। আর কাউরে কিছু বলবি না।
বিশ মিনিট পর আমরা পৌঁছে গেলাম। বাড়ির সামনে অবস্থা দেখে মনে হলো পুলিশ সন্ত্রাসী ধরতে নামছে। লুঙ্গি পরা কয়েকজন লোক হাতে লাঠি নিয়ে হাঁটাহাঁটি করতেছিল। একজন আবার ক্রিকেট স্ট্যাম্পও হাতে রাখছে। আমি ফিসফিস করে বললাম, ভাই, আমরা মানুষ বাঁচাইতে আসছি, না আইপিএল খেলতে?
রকি ভাই সিগারেট ধরালেন। তারপর সেই বিখ্যাত হাঁটা শুরু করলেন। ধীরে ধীরে সামনে এগাইলেন। উনার হাঁটা দেখলে মনে হয় হয় উনি শান্তি চুক্তি করবেন, না হয় কাউরে গায়েব করার অর্ডার দিবেন।
গেটের সামনে গিয়ে উনি বললেন, কি সমস্যা? মুনিয়ার বড় ভাই চোখ লাল করে বললো, একটা পোলা আমার বোনরে ভাগাইয়া বিয়া করছে। রকি ভাই শান্ত গলায় বললেন, ভাগায় নাই। আইনসম্মত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। লোকটা থমকে গেল।
আপনি কে?
রকি ভাই ধোঁয়া ছাড়লেন। আমি ওদের পারিবারিক উপদেষ্টা।
আমি পাশে দাঁড়িয়ে এমন ভাব ধরলাম যেন গতকালই জাতিসংঘে মধ্যপ্রাচ্য সংকট সমাধান করে আসছি। এমন সময় ছাদ থেকে রিপনের ফোন। দোস্ত... মশা অনেক।
আমি দাঁত চেপে বললাম, তুই এখন রোমান্টিক অবস্থায় নাই। মশা সহ্য কর। ওপাশ থেকে রিপন বললো, একটা মশা কানের মধ্যে ঢুইকা গেছিল।
এদিকে নিচে সালিশ চলতেছিল। মুনিয়ার মা কাঁদতেছিলেন। খালারা রিপনকে নাটের গুরু ডাকতেছিলেন। একটা ছোট্ট বাচ্চা বারবার জিজ্ঞেস করতেছিল, এখন কি মারামারি হবে? আমি বুঝলাম পুরো পরিবার এন্টারটেইনমেন্ট মুডে চলে গেছে। সবার ধারণা এই বাসায় কোথায় রিপন লুকিয়ে আছে। তবে কোথায় লুকিয়ে সেটা কেউ নিশ্চিত নয়। রকি ভাই বললো, রিপন কই লুকায়ে আছে আমি জানি, তারে আনতাছি।
সবাই মিলে ছাদে গেলাম। রকি ভাই সোজা গিয়ে ট্যাংকির ঢাকনা খুলে বললো, বের হয়ে আসো রিপন।
রিপন পানির ট্যাংকি থেকে বের হতেই আমি হাঁ হয়ে গেলাম। তার মাথায় গোলাপি ওড়না। আমি ফিসফিস করে বললাম, এটা আবার কি? সে লজ্জিত মুখে বললো, মুনিয়াকে কল দিছিলাম, সে ছাদে এসে ওড়নাটা দিয়ে গেছে।
কেন?
কইছে মাথা ঢেকে নামলে কম মার খামু।
আমি মুখ ঘুরিয়ে হাসি চাপতে গিয়ে প্রায় দম বন্ধ করে ফেললাম। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, রিপন ওড়নার সঙ্গে ম্যাচিং করে মুনিয়ার একটা ছোট্ট পার্সও হাতে ধরে রাখছিল। ওই পাশ থেকে কাজি অফিসের রেজিস্টার বইয়ের দুই পাতা ফটোকপি রকি ভাইয়ের হাতে ধরিয়ে দিলো রিপন।
এবার রকি ভাইয়ের মুখে সূর্যের হাসি ফুটে উঠলো। রকি ভাই চিৎকার করে বললো, বলছিলাম না ও আইনসম্মত কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এই দেখেন কাবিননামা! সবাই সেটা দেখলো। ধীরে ধীরে পরিবেশ ঠান্ডা হয়ে গেল।
মুনিয়াদের বাসার ড্রয়িং রুমে সবাই বসে আছি। এবার ঘটনা অন্যরকম দাঁড়িয়েছে। যে লোকজন আধা ঘণ্টা আগে রিপনকে খুঁজে মারতে চাইতেছিল, তারা এখন মিউচুয়াল শালিশে বসেছে। মুনিয়ার বাবা এখন নরম সুরে কথা বলছে। রকি ভাইকে বললো, দেখেন রকি ভাই, আপনি দায়িত্ব নিয়ে এই বিয়া মাইনা নিবো। আর রিপনের দিকে তাকিয়ে বললো, প্রতিষ্ঠিত হতে পারলে ভবিষ্যতে দেখা যাবে।
রিপন কাঁপা গলায় বললো, জি আব্বা, আমি দ্রুতই প্রতিষ্ঠিত হবো।
লোকটা চোখ রাঙিয়ে বললো, আমারে আব্বা ডাকবি না এখনই।
আবার টেনশন শুরু। ভাবটা এমন, মুনিয়ার ভাই অপেক্ষা করছে, কখন তার বাপ মাইরপিটের হুকুম দেয়। হুকুম দিলেই জিমে যাওয়ার রেজাল্ট ট্রাই করবে রিপনের উপর। আমি রিপনেরে কইলাম, আগে তুই একা মাইর খাওয়ার তাল করছিলি। এখনই আমাগো তিনজনরে মাইর খাওয়াবি। ব্যাটা চুপ থাক। অনেক কথাবার্তা চলার পর মুনিয়ার মা চা দিয়ে গেলো সবাইকে। চা খেতে খেতে মুনিয়ার বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, যা হওয়ার হইছে। এখন সামাজিকভাবে অনুষ্ঠান করুম। সবাই শান্ত হয়ে গেল। মিশন সফল।
বের হয়ে রাস্তায় দাঁড়াতেই রিপন আমাকে জড়িয়ে ধরলো। দোস্ত... তোরা না থাকলে আজকে আমি মইরা যাইতাম। রকি ভাই গম্ভীর মুখে বললেন, মইরতি না। কিন্তু জীবনভর চেয়ারে বইসা চলতে হইতো।
ফিরতি পথে আমি রকি ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই, আপনি এত কনফিডেন্ট থাকেন কেমনে? উনি বিরক্ত মুখে বললেন, কনফিডেন্ট না। আমি ভয় পাইছিলাম।
আমি অবাক হয়ে বললাম, তাইলে বুক ফুলায়া হাঁটতেছিলেন কেন? রকি ভাই দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। পেটে গ্যাস আছিল। আমি থমকে গেলাম।
উনি আবার বললেন, ঢেকুর আটকাইতে গিয়া বুক বাইর হইয়া গেছিল। আমি রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে এমন হাসি দিলাম, এক রিকশাওয়ালা ব্রেক কষে আমার দিকে তাকায়া রইলো।
সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি রিপনের মেসেজ। Bro... married life started. Pray for me.
তার নিচে আরেকটা মেসেজ। শ্বশুর কইছে চাকরি না পাইলে বাসায় ঢুকতে দিবে না।
আমি রিপ্লাই দিলাম, ভাই, পানির ট্যাংকের জায়গাটা মনে রাখিস। সামনে আবার লাগতে পারে।

0 Comments