About Me

কাঁচের দেয়ালের ভিতর বৃষ্টি




নয়তলার সেই অফিসে
তোমাকে প্রথম দেখেছিলাম বৃষ্টির দিনে।
মনিটরের নীল আলো মুখে পড়েছিল।
মনে হয়েছিল
দূর কোনো নদীর ধারে বসে আছো তুমি,
এই শহরের মানুষ নও।
বাইরে তখন বনানীর রাস্তা ভিজে।
গাড়ির লাল আলো
বৃষ্টির ভিতর কেঁপে কেঁপে উঠছিল।
ঢাকা শহর বর্ষায় কেমন ধূসর হয়ে যায়।
মনে হয়
সব মানুষ কোথাও ফিরছে,
শুধু কিছু মানুষ
ফেরার জায়গা খুঁজে পায় না।
তুমি খুব আস্তে কথা বলতে।
কফির কাপ হাতে
জানালার দিকে তাকিয়ে থাকতে চুপচাপ।
মাঝে মাঝে মনে হতো
তুমি এই অফিসে নও,
অন্য কোথাও আছো।
তারপর ধীরে ধীরে
সন্ধ্যা ঘন হতে লাগল আমাদের মধ্যে।
অফিস ফাঁকা হয়ে গেলে
চেয়ারগুলো পরিত্যক্ত লাগে।
এসি চলতে থাকে নিঃশব্দে।
দূরে কোথাও প্রিন্টারের শব্দ।
কাঁচের দেয়ালে বৃষ্টির রেখা
নিচে নামতে থাকে।
সেইসব সন্ধ্যায়
তোমাকে খুব একা লাগত।
মনে হতো
বহুদিন ধরে তুমি
কারও জন্য অপেক্ষা করে আছো।
একদিন হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিল।
চারদিকে অন্ধকার।
শুধু জরুরি লাইট জ্বলছিল ক্ষীণভাবে।
বাইরে তখন বৃষ্টি।
তুমি খুব কাছে এসে দাঁড়িয়েছিলে।
আমি প্রথমবার
মানুষের শরীরের ভিতর
এত নিঃসঙ্গতা দেখেছিলাম।
যেদিন প্রথম তুমি জড়িয়ে ধরলে
ঢাকা শহর আরও দূরে সরে গেল।
মহাখালীর জ্যাম,
বনানীর আলো,
ভেজা রাস্তা,
সব কেমন ঝাপসা হয়ে গেল ধীরে।
মনে হয়েছিল
পৃথিবীতে আমরা দুজন ছাড়া
আর কেউ নেই।
তারপর একদিন
তুমিই বললে
এভাবে থাকা যায় না।
কিভাবে থাকা যায়
সেটা আমরা কেউই জানতাম না।
বৃষ্টি তখনও ছিল।
নয়তলার কাঁচে জল পড়ছিল ধীরে ধীরে।
আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলাম।
ঢাকা তখনও জেগে।
অসংখ্য মানুষ ফিরছে ঘরে।
কেউ ক্লান্ত,
কেউ ভিজে,
কেউ হয়তো এইমাত্র ভালোবেসে ফেলেছে কাউকে।
হঠাৎ মনে হয়েছিল
জীবনে কিছু কিছু মানুষ আসে
শুধু বৃষ্টির মতো।
অল্প সময় থাকে।
তারপর ধীরে ধীরে
সমস্ত শহর ভিজিয়ে
অদৃশ্য হয়ে যায়।
আজও বনানীর ওই কাঁচের ভবন দেখলে
তোমার কথা মনে পড়ে।
মনে হয়
তুমি এখনও কোথাও বসে আছো
মনিটরের নীল আলোয়।
বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে।
ঢাকা শহর ঘুমিয়ে পড়ছে ধীরে।
আর আমি
অনেকদিন পরে
একটা পুরোনো বর্ষার ভিতর
এখনও হেঁটে যাচ্ছি একা।

Post a Comment

0 Comments