জেন-জেড প্রজন্ম কাদের অনুসরণ করবে?
মানবসমাজে প্রতিটি প্রজন্মেরই থাকে কিছু অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব ও নায়ক। অতীতে মানুষ ধর্মীয় নেতা, দার্শনিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, বিপ্লবী কিংবা বিজ্ঞানীদেরকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছে। তাদের জীবনদর্শন, সংগ্রাম ও মূল্যবোধই সাধারণ মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করেছে। কিন্তু সময়ের পরিবর্তন ও প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির কারণে বিশেষত জেনারেশন জেড বা সংক্ষেপে জেন-জেড প্রজন্ম (১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্ম) পূর্ববর্তী প্রজন্মের মতো নির্দিষ্ট ব্যক্তিত্বকে অনুসরণ না করে ভিন্নধর্মী ও বিচিত্র উৎস থেকে প্রভাব গ্রহণ করছে।
প্রশ্ন হলো: বর্তমান সময়ে জেন-জেড প্রজন্ম কাদের অনুসরণ করবে?
এই প্রবন্ধে আমরা জেন-জেড প্রজন্মের বৈশিষ্ট্য, তাদের বর্তমান অনুসরণ প্রবণতা, আন্তর্জাতিক গবেষণা ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
নিয়ে বিশ্লেষণ করব। শেষে একটি সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত দেওয়ার চেষ্টা করব।
জেন-জেড প্রজন্মের বৈশিষ্ট্য
বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী জেন-জেড প্রজন্মের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে চোখে পড়ে—
1. ডিজিটাল নেটিভ: তারা জন্ম থেকেই ইন্টারনেট, স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়ার
মধ্যে বড় হয়েছে। এজন্য
তাদের চিন্তাভাবনা, শেখা ও যোগাযোগ পদ্ধতি
ডিজিটাল মাধ্যমে নির্ভরশীল।
2. স্বাধীনচেতা ও সমালোচনামুখর: আগের প্রজন্মের তুলনায় তারা প্রচলিত কর্তৃত্বকে সহজে মেনে নেয় না। তারা যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে
সিদ্ধান্ত নিতে চায়।
3. বৈচিত্র্যের প্রতি সহনশীলতা: লিঙ্গ, জাতি, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ভিন্নতার
প্রতি তাদের গ্রহণযোগ্যতা বেশি।
4. সামাজিক সচেতনতা: জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার, সমতা ইত্যাদি বিষয়ে তারা সক্রিয়।
5. অল্প মনোযোগের সময়কাল (Short attention
span): টিকটক
বা রিলস সংস্কৃতি তাদেরকে সংক্ষিপ্ত বিনোদন ও দ্রুত তথ্যের
প্রতি অভ্যস্ত করেছে।
অতীতে অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বদের প্রভাব
অতীতে তরুণদের জন্য অনুসরণীয় ব্যক্তিত্বের তালিকা ছিল বেশ সুস্পষ্ট। যেমন:
·
ধর্মীয়
নেতা
ও সাধকগণ: সত্য, ন্যায় ও নৈতিকতার শিক্ষা
দিতেন।
·
জাতীয়
নেতা
ও মুক্তিযোদ্ধারা: দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও স্বাধীনতার আদর্শে
তরুণদের উজ্জীবিত করেছেন।
·
সাহিত্যিক
ও দার্শনিকরা: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম বা জীবনানন্দ দাশের
মতো কবি সাহিত্য ও মানবতাবাদকে সামনে
এনেছেন।
·
বিজ্ঞানী
ও উদ্ভাবকরা: আইজ্যাক নিউটন, আইনস্টাইন বা জগদীশ চন্দ্র
বসুর মতো বিজ্ঞানীরা তরুণদের বিজ্ঞানচর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছেন।
অতএব, পূর্ববর্তী প্রজন্মের তরুণরা মূলত নৈতিকতা, দেশপ্রেম ও জ্ঞানচর্চার ধারায়
প্রভাবিত হতো।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে জেন-জেডের অনুসরণ প্রবণতা
আজকের জেন-জেড প্রজন্মের অনুসরণ প্রবণতা পূর্ববর্তী ধারা থেকে ভিন্ন। তারা এখন—
1. সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার: টিকটক, ইউটিউব, ইনস্টাগ্রামের তারকারা তাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব বিস্তার করে।
2. ক্রীড়া ও সংগীত তারকা: লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, টেলর সুইফট, কেপপ তারকারা জেন-জেডদের কাছে আদর্শ।
3. প্রযুক্তি উদ্যোক্তা: ইলন মাস্ক, মার্ক জাকারবার্গ, সত্য নাদেলা কিংবা স্টিভ জবসের মতো ব্যক্তিত্ব তাদের কাছে উদ্ভাবন ও সাফল্যের প্রতীক।
4. অ্যাকটিভিস্ট ও পরিবেশবাদী নেতা: গ্রেটা থানবার্গের মতো তরুণ পরিবেশবাদীরা তাদের মধ্যে সামাজিক আন্দোলনের অনুপ্রেরণা জাগায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, জেন-জেডরা মূলত Authenticity
(সত্যনিষ্ঠা)
ও Relatability
(সম্পর্কযোগ্যতা)
খোঁজে। অর্থাৎ তারা এমন ব্যক্তিত্বকে অনুসরণ করে যাদেরকে সত্যিকারের, খোলামেলা এবং তাদের মতো মনে হয়।
প্রযুক্তি, সোশ্যাল মিডিয়া ও ইনফ্লুয়েন্সার কালচার
ডিজিটাল যুগে তথ্যের প্রবাহ এত দ্রুত যে,
একটি ভিডিও বা পোস্ট কয়েক
ঘণ্টার মধ্যে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এর ফলে ইনফ্লুয়েন্সাররা
নতুন প্রজন্মের কাছে মূল নায়ক হয়ে উঠেছে।
তবে এর ইতিবাচক ও
নেতিবাচক দুই দিক রয়েছে—
·
ইতিবাচক
দিক:
অনেক ইনফ্লুয়েন্সার তরুণদের সৃজনশীলতা, উদ্যোক্তা মানসিকতা বা শিক্ষায় উৎসাহিত
করছে।
·
নেতিবাচক
দিক:
অনেকেই ভোগবাদ, অগভীর বিনোদন ও অনৈতিক সংস্কৃতি
প্রচার করছে। ফলে স্থায়ী মূল্যবোধ গড়ে উঠতে বাধা পাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য
·
ডেলয়েটের
এক জরিপ (2022) দেখায়, ৭০% জেন-জেড বলে তারা এমন ব্র্যান্ড বা ব্যক্তিত্বকে অনুসরণ
করে যারা সামাজিক দায়িত্ব পালন করে।
·
পিউ
রিসার্চ সেন্টার (2020) জানিয়েছে, জেন-জেড প্রজন্ম রাজনীতি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের
বিষয়ে পূর্ববর্তী প্রজন্মের তুলনায় বেশি সক্রিয়।
·
Forbes (2023) উল্লেখ করেছে,
জেন-জেডরা “সত্যিকারের কণ্ঠস্বর” ও “ব্যক্তিগতভাবে মেলাতে
পারা” নেতাদেরকেই অনুসরণ করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের জেন-জেড প্রজন্মও বিশ্বব্যাপী প্রবণতার বাইরে নয়। তারা—
·
সোশ্যাল
মিডিয়া তারকা ও গেমিং কনটেন্ট
ক্রিয়েটরদের বেশি অনুসরণ করে।
·
ক্রীড়াবিদ
সাকিব আল হাসান, মাশরাফি
বিন মর্তুজা কিংবা সংগীতশিল্পীদের প্রভাবও প্রবল।
·
তবে
ইতিবাচক দিক হলো—স্টার্টআপ উদ্যোক্তা, তরুণ লেখক, পরিবেশবাদী বা টেক-এক্সপার্টরাও
ধীরে ধীরে অনুসরণীয় হয়ে উঠছে।
সম্ভাব্য অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব বা ক্ষেত্র
আজকের জেন-জেড প্রজন্মকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে হলে শুধু ট্রেন্ডি ইনফ্লুয়েন্সার নয়, বরং—
1. বিজ্ঞানী ও উদ্ভাবক: যারা মানবতার কল্যাণে প্রযুক্তি তৈরি করছে।
2. নৈতিক নেতৃত্বসম্পন্ন রাজনীতিবিদ: দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ নেতৃত্ব তরুণদের আস্থা ফেরাতে পারে।
3. সামাজিক উদ্যোক্তা: যারা সমাজের সমস্যার সমাধান করছে।
4. পরিবেশবাদী ও মানবাধিকারকর্মী: যারা পৃথিবীকে টেকসই করতে কাজ করছে।
উপসংহার ও সিদ্ধান্ত
অতীতে যেমন তরুণরা কবি, সাধক, মুক্তিযোদ্ধা বা বিজ্ঞানীদের অনুসরণ
করেছে, আজকের জেন-জেডও আদর্শ খুঁজছে। তবে তাদের অনুসরণের ধরন বদলেছে। তারা ট্রেন্ডের নায়ককেও অনুসরণ করছে, আবার নৈতিকতা ও উদ্ভাবনের প্রতীককেও খুঁজছে।
অতএব, বলা যায়—
👉 জেন-জেড প্রজন্মের জন্য অনুসরণীয় হওয়া উচিত এমন ব্যক্তিত্ব, যারা একদিকে সত্যনিষ্ঠ (Authentic), অন্যদিকে সম্পর্কযোগ্য (Relatable), একইসঙ্গে সমাজ, পরিবেশ ও মানবতার প্রতি দায়িত্বশীল।
বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে যদি নৈতিক নেতৃত্ব, বিজ্ঞানমনস্ক উদ্ভাবক ও মানবিক উদ্যোক্তাদের
সামনে তুলে ধরা যায়, তবে নতুন প্রজন্মও বিভ্রান্তি কাটিয়ে স্থায়ী মূল্যবোধসম্পন্ন অনুসরণীয় পথ খুঁজে পাবে।